ব্রয়লার মুরগি ও অতিরিক্ত প্রাণীজ আমিষ খাওয়ার ভয়ঙ্কর পরিণতি!

published : ২২ অক্টোবর ২০২৬

আজ থেকে তিন দশক আগেও মুরগির মাংস এতটা সুলভ ছিল না। আর গরু-খাসি তো বরাবরই বড়লোকের খাবার! কাজেই নিয়মিত পাতে মাংস জোটানো সম্ভব হতো না বেশিরভাগ মানুষেরই। 

সেই অভাব পূরণ করেছে পোল্ট্রি ফার্মিং

এখন অল্প আয়ের মানুষেরাও যে মাঝেমধ্যে মাংস খেতে পারছেন তা এর বদৌলতেই।

১০০ গ্রাম ব্রয়লার মুরগির মাংসে প্রোটিন থাকে ২৫-৩০ গ্রাম! এতে ক্যালরিও তুলনামূলক কম। ফলে ব্রয়লার মুরগি কম ক্যালরিতে প্রোটিনের চাহিদা পূরণের সুলভ উৎস।

একটি ব্রয়লার মুরগির ওজন ২ কেজি হয়ে যায় মাত্র ৫-৬ সপ্তাহে! ফলে মুরগির মাংসের উৎপাদন ও সরবরাহ বেড়েছে অবিশ্বাস্যভাবে। 

কিন্তু মুরগির ওজন এত দ্রুত বাড়ে কীভাবে? অন্যতম কারণ এন্টিবায়োটিক গ্রোথ প্রমোটারের ব্যবহার। 

ব্রয়লার মুরগি খাওয়ার বিপদ

রোগ সংক্রমণ ঠেকাতে এন্টিবায়োটিকের প্রয়োজন আছে। কিন্তু মুরগির ওজন দ্রুত বাড়াতে যখন এটি অতিরিক্ত ব্যবহার করা হয় তখনই তা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই মাংস খেলে শরীরে এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স তৈরি হতে পারে। যার পরিণতি এন্টিবায়োটিক খেয়ে উপকার না পাওয়া। 

তবে পোল্ট্রি মুরগি থেকে স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টির বড় কারণ এর ফিড বা খাবার। বেশি লাভের জন্যে অনেক খামারি মুরগিকে বিষাক্ত বর্জ্যমিশ্রিত খাবার খাওয়ায়। যা থেকে এর মাংসে জমে বিষাক্ত পদার্থ। 

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় ব্রয়লার মুরগির মাংস ও হাড়ে পাওয়া গেছে উচ্চমাত্রার নিকেল, ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়াম, সিসা ও আর্সেনিক। যা এসেছে এদের খাবার থেকে। এসব ভারী ধাতুর কারণে মানবদেহে সৃষ্টি হতে পারে বিভিন্ন ধরণের ক্যান্সার, কিডনি ডিজিজ, ডায়াবেটিসসহ মারাত্মক সব রোগ।

তাহলে কি ব্রয়লার মুরগি খাওয়া যাবে না?

বলবেন, ঘরে পালা দেশি মুরগি এখন বলতে গেলে পাওয়াই যায় না। পেলেও দাম আকাশছোঁয়া! পোল্ট্রি মুরগি না খেয়ে উপায় আছে!

আসলে ক্ষতির কথা আমরা বলি আর না-ই বলি, দিনের পর দিন পোল্ট্রি মুরগি, চাষের মাছ খেয়ে স্বাস্থ্যের যে মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে, এটা হবেই, যদি না আপনি এসব খাওয়া বাদ দেন।

পুরোপুরি বাদ দিতে না পারলে কমান। এখন সপ্তাহে ৫ দিন খেলে কমিয়ে ১ বা ২ দিন করেন। খাওয়া যতটা কমাবেন, ক্ষতিও কমবে ততটাই।

আর মাছ মুরগি গরু খাসি- গৃহস্থের পালা হোক, কিংবা ব্যবসায়ীর ফার্মে প্রতিপালিত, এগুলো বেশি বেশি খাওয়া আসলে প্রকৃতিবিরুদ্ধ কাজ!

মানুষের সঠিক খাদ্যাভ্যাস কী? প্রকৃতি যা বলে

হরিণ তৃণভোজী প্রাণী- এর পরিপাকতন্ত্রের দৈর্ঘ্য গড়ে ২৮ ফুট। তৃণলতায় প্রচুর আঁশ বা ফাইবার থাকে, যা হজম করার জন্যে প্রয়োজন এরকম দীর্ঘ পরিপাকতন্ত্র।

বাঘ মাংসাশী- এর পরিপাকতন্ত্রের দৈর্ঘ্য গড়ে ৩ থেকে ৭ ফুট। এত কম, কারণ মাংসে যেহেতু ফাইবার থাকে না, তাই বাঘের পরিপাকতন্ত্র বেশি লম্বা হওয়ার প্রয়োজন নেই।

সর্বভুক প্রাণী মানুষের পরিপাকতন্ত্রের দৈর্ঘ্য কত জানেন? গড়ে ৩০ ফুট! 

অর্থাৎ, পরিপাকতন্ত্রের দৈর্ঘ্যই বলছে- আমাদের খাদ্যাভ্যাস হওয়া উচিৎ মূলত তৃণভোজী প্রাণীদের মতো!  মাছ-মাংস খাওয়া যাবে, তবে কম।  

কতটা? এর জবাবও আছে প্রকৃতিতেই!

বিড়াল কুকুর বাঘের দাঁত দেখেছেন না? সবই চোখা চোখা। এমন চোখা দাঁতই দরকার মাংস ছেড়ার জন্যে।

গরু ছাগল মহিষের দাঁত? যেহেতু মাংস ছেঁড়ার প্রয়োজন হয় না, তাই দাঁতও চোখা নয়।

আর মানুষের দাঁত? উপর-নিচ চোয়ালের দুটো করে মোট ৪টা দাঁত মাংসাশী প্রাণীর মতো চোখা। বাকি ২৮টা দাঁত তৃণভোজীদের মতো। অনুপাত দাঁড়াচ্ছে ১:৭!

তার মানে প্রকৃতিই বলছে প্রতি ৭ দিন উদ্ভিজ্জ খাবারের বিপরীতে মানুষ মাংস খাবে ১ দিন, এটাই তার জন্যে উপযুক্ত খাদ্যাভ্যাস।

অথচ আমরা বানিয়ে ফেলেছি উল্টো! 

আমরা ৭ দিন মাংস খাই, ১ দিন খাই নিরামিষ। সেদিনও পাতে থাকে ডিম! 

মানে রোজই আমরা প্রাণীজ আমিষ খাচ্ছি। আর এই প্রকৃতিবিরুদ্ধ আহারের পরিণতি হলো ঘরে ঘরে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যান্সার, ফ্যাটি লিভার ডিজিজ। এসব রোগকে বলা হয় ‘লাইফস্টাইল ডিজিজ’; মানে ভুল খাদ্যাভ্যাস ও লাইফস্টাইলের কারণে এগুলো হয়। 

১৯৮৬ সালেও আমাদের দেশে এসব অসংক্রামক রোগে মৃত্যু ছিল মোটের ৮ শতাংশ, এখন তা ৭১ শতাংশ! মানে ১০০ মৃত্যুর ৭১টাই ঘটছে ভুল খাদ্যাভ্যাস ও লাইফস্টাইলের কারণে, যার অন্যতম হলো অতিরিক্ত প্রাণীজ আমিষ খাওয়া। 

সমাধান কী?

সমাধান হলো কায়িক পরিশ্রম বৃদ্ধি, প্রক্রিয়াজাত খাবার বর্জন, স্ট্রেসমুক্তি এবং প্রকৃতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ খাবার গ্রহণ। 

৭ দিন উদ্ভিজ্জ খাবার- শাকসবজি, ডাল, ফলমূল ইত্যাদি খাওয়ার বিপরীতে ১ দিন খান মাছ মাংস। রোজকার আমিষের চাহিদা মেটান ডাল, ছোলা, শিম, সয়াবিন ও সয়াদুধ, বাদাম, বীজ, ওটস, লাল চাল ইত্যাদি উদ্ভিজ্জ উৎস থেকে। 

এভাবে খেলে অতিরিক্ত প্রাণীজ আমিষ খাওয়ার ক্ষতি থেকে যেমন বাঁচবেন, তেমনি নিরাপদ থাকবেন চাষের মাছ পোল্ট্রি মুরগি খাওয়ার ক্ষতি থেকেও। সুস্থতা ও সুস্বাস্থ্য হবে আপনার আমৃত্যু সঙ্গী।