
published : ১১ জুন ২০২৬
আপনি কি ফাস্টফুড-জাঙ্কফুড খেতে ভালবাসেন- বার্গার, পিৎজা, হটডগ, স্যান্ডউইচ, চিকেন ফ্রাই, ডোনাট…। কিংবা আইসক্রিম, লাচ্ছি, ফ্রুটজুস, মিল্কশেক, সফট ড্রিঙ্কের মত চিনিসমৃদ্ধ খাবার?
উত্তর যদি ‘হ্যাঁ’ হয় তাহলে দীর্ঘমেয়াদে স্মৃতিক্ষয় করে চলেছেন আপনি!
ইউনিভার্সিটি অফ সিডনির একদল গবেষক গবেষণা করে দেখেছেন, ফাস্টফুড, যাতে চিনি ও চর্বি থাকে পর্যাপ্ত, ক্ষতি করে দুভাবে- একদিকে ক্ষুধা বাড়ায়, ফলে অনেক খেয়েও তুষ্ট হওয়া যায় না। অন্যদিকে স্মৃতিকে করে ফেলে দুর্বল। কারণ উচ্চ ফ্যাট ও চিনিসমৃদ্ধ খাবার ব্রেনের সেই অংশটিকে চূড়ান্তভাবে বদলে দেয় যা স্মৃতি ধরে রাখে।
ষাটোর্ধ ব্যাক্তিদের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় বিজ্ঞানীরা MRI পদ্ধতি ব্যবহার করে মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাসের আকার পর্যবেক্ষণ করেন। এতে দেখা যায় যারা মিষ্টি পানীয়, লবণযুক্ত খাবার ও প্রক্রিয়াজাত মাংস বেশি খান তাদের মস্তিষ্কের বাম পাশের হিপোক্যাম্পাস আকারে ছোট হয়।
এই বাম হিপোক্যাম্পাস এপিসোডিক মেমোরি তথা পারিপার্শ্বিক ঘটনা ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতালব্ধ স্মৃতির সাথে সংশ্লিষ্ট। বাম হিপোক্যাম্পাস ছোট হয়ে যাওয়ার অর্থ হলো জীবনের বাঁকে বাঁকে ঘটা সবকিছু স্মৃতি থেকে মুছে যাওয়া। যার পরিণাম অ্যালঝেইমার বা স্মৃতিভ্রষ্টতা।
বেশি বেশি চর্বি ও চিনি সারাদেহে ইনফ্ল্যামেটরি রি-একশন তথা প্রদাহমূলক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, যা পৌঁছে যায় মস্তিষ্কের নিউরোন অবধি।
সাধারণভাবে ব্লাড-ব্রেইন ব্যারিয়ার নামক একটি ঝিল্লি মস্তিষ্ককে প্রদাহ সৃষ্টিকারী পদার্থ থেকে সুরক্ষা দেয়। কিন্তু চিনি ও চর্বিজাতীয় খাবার বেশি খেলে এই ঝিল্লি ছিদ্র হয়ে ক্ষতিকর পদার্থ মস্তিষ্কে প্রবেশের সুযোগ পায়।
পরিণামে মস্তিষ্কে প্রদাহ, যার ফলে হতে পারে- জ্বর, মাথাব্যথা, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, বমি ও বমি বমি ভাব, ডাবল ভিশন, মাথা ঝিম ঝিম করা।
এমনকি বাকশক্তি, শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তিও হতে পারে ক্ষতিগ্রস্ত।
ফ্রান্সের ইউনিভার্সিটি অফ বোর্দোর নিউট্রিনিউরো ইনস্টিটিউটের প্রধান সোফি লেয়ি তার ল্যাবরেটরিতে কিছু ইঁদুরের ওপর একটি গবেষণা চালান।
ইঁদুরগুলোকে প্রচুর পরিমাণে ফাস্টফুড খেতে দেয়া হয়। একটা পর্যায়ে দেখা গেল ওগুলোর ব্রেনের মাইক্রোগ্লিয়াল সেল নিউরোনকে খেতে শুরু করেছে!
সাধারণভাবে মাইক্রোগ্লিয়াল সেল মৃত নিউরোন কোষ খেয়ে মস্তিষ্ককে আবর্জনামুক্ত রাখে। কিন্তু ভারসাম্যহীন খাদ্যাভ্যাসের ফলে সেলগুলো অনিয়ন্ত্রিত হয়ে একটা পর্যায়ে জ্যান্ত নিউরোনকেও খেতে থাকে। ফলশ্রুতিতে ধ্বংস হতে থাকে নিউরাল নেটওয়ার্ক।
আমাদের ব্রেনের ১০০ বিলিয়ন নিউরোন একটি অপরটির সাথে সংযুক্ত।
একারণে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন ব্রেনের যে অংশ আবেগ ও আনন্দকে নিয়ন্ত্রণ করে গ্লুকোজ বা চিনি তার পুরোটাকে পরিবর্তিত করার ক্ষমতা রাখে।
এডিকশন বা আসক্তি শব্দটি শুনলে প্রথমেই মাথায় আসে মাদকদ্রব্যের কথা। কিন্তু চিনি যে এসব আসক্তি সৃষ্টিকারী পদার্থের চেয়ে কম তো নয়ই, বরং অনেক তীব্র মাদকের চেয়েও বেশি আসক্তিকর তা কি আপনি জানেন?
বিষয়টি জানা গেছে ইঁদুরের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণা থেকে।
ইঁদুরগুলোকে টানা কয়েক সপ্তাহ কোকেন এবং চিনি খেতে দেয়া হয়। এরপর তাদের সামনে রাখা হয় দুটি অপশন- একটিতে ছিল কোকেনের দ্রবণ, অন্যটিতে মিষ্টি পানীয়। গবেষকেরা বিস্ময়ের সাথে দেখলেন, ইঁদুরগুলো কোকেন নয়, বেঁছে নিয়েছে চিনি!
যতবার কোকেন পছন্দ করেছিল তার চেয়ে ৪ গুণ বেশি বার পছন্দ করেছিল সুগার ওয়াটার।
একটি দুটি নয়, এরকম অজস্র গবেষণা থেকে এটা প্রমাণিত হয়েছে যে চিনির আসক্তি ক্ষমতা কোকেন বা হেরোইনের চেয়ে বেশি। যে কারণে দেখবেন অনেকেই একটি নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের ফাস্টফুড, যা সে টানা কিছুদিন খেয়েছে, এটা ছাড়া অন্যকিছুই সে খেতে চায় না।
অনেক শিশু আছে যাদের ভিন্ন ব্র্যান্ডের পটেটো চিপস দিলে তা ছুঁড়ে ফেলে দেয়। কারণ যে ব্র্যান্ডের চিপস সে এতদিন খেয়েছে সেটাতেই সে আসক্ত হয়ে পড়েছে! এর কারণ হলো সুগার মস্তিষ্কের রিউয়ার্ড সিস্টেমকে বদলে দেয়।
চিনি মস্তিষ্কের প্রতিটি কোষে জ্বালানী সরবরাহ করে। একারণে মস্তিষ্ক একে রিওয়ার্ড বা পুরস্কার হিসেবে বিবেচনা করে। যেকারণে একে বারবার পেতে চায়; এটা-ই আসক্তি!
প্রশ্ন করতে পারেন, ফলমূল বা সবজিতেও তো চিনি আছে, তাহলে এগুলো কেন আসক্তি সৃষ্টি করে না?
আসলে সরাসরি চিনি বা চিনিসমৃদ্ধ প্রক্রিয়াজাত খাবারের চিনি দ্রুত গ্লুকোজে পরিণত হয়ে রক্তে মিশে যায়। কিন্তু ফল বা সবজিতে থাকা আঁশ ও প্রোটিন প্রক্রিয়াটিকে স্লথ করে ফেলে। যে কারণে চিনির মতো আসক্তিকর নয় এগুলো।
অন্যদিকে, চিপস, ফ্রেঞ্চফ্রাই, পাস্তা, সাদা পাউরুটি, সাদা আটা, ময়দা- এগুলোতে সরাসরি চিনি নেই ঠিকই, তবে আমাদের শরীর এই স্টার্চি খাবারগুলোর শর্করাকে ভেঙে সাধারণ চিনিতে পরিণত করে। অর্থাৎ, শেষমেশ সেই চিনি-ই! যেকারণে চিনির মতো এগুলোও মানুষকে আকৃষ্ট করে বারবার খেতে।
কোনো আসক্তিই একদিনে ছাড়া সম্ভব নয়; এর জন্যে লাগে ইচ্ছাশক্তি, মনোযোগ ও সময়। একদিনে সব ধরণের চিনিযুক্ত খাবার বাদ দিলে কিছুদিন হয়ত সংযত থাকতে পারবেন, কিন্তু এরপর আগের চেয়েও তীব্রভাবে এগুলোর প্রতি ঝুঁকে পড়বেন আপনি। তাই শুরুটা করুন বেবি স্টেপ দিয়ে, ছোট্ট শিশু যেভাবে হাঁটি হাঁটি পা পা করে হাঁটতে শেখে।
এজন্যে আপনি আপনার খাদ্যাভ্যাস পর্যালোচনা করুনঃ
-লাঞ্চ বা ডিনারের পর কি মিষ্টি কোনো ডেজার্ট খান?
-বিকেলে ফাস্টফুড বা সুগার ড্রিঙ্ক কি আপনার প্রতিদিনের অভ্যাস?
-ভরপেট খেয়ে সফট বা ফিজি ড্রিঙ্কের ক্যান না খুললেই নয়?
প্রতি সপ্তাহে একটি করে অভ্যাস আপনি বর্জন করুন। চা বা কফিতে যতটা চিনি খান এখন থেকে তার অর্ধেকটা করে নিন। চিনির বিকল্প গ্রহণ করতে পারেন, তবে আর্টিফিসিয়াল সুইটেনার বা সুগার সাবস্টিটিউটের দিকে যাবেন না। ওগুলো চিনির প্রতি আকর্ষণ আরো বাড়িয়ে দেয়।
এখন বাজারে আছে আম কাঁঠাল লিচু; এই মৌসুমে ডেজার্ট হিসেবে এগুলো খেতে পারেন। আর শুকনো খেজুর আপনি খেতে পারেন বছরজুড়ে। সুগার-ক্রেভিং এড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখে ফলের আঁশ।
যেসব খাবারে আপনি চিনি ব্যবহার করেন সেগুলোর কোন কোনটিতে আপনি খেজুর বা অন্য মিষ্টি ফল কাজে লাগাতে পারেন। যেমন- ওটমিল। মিষ্টি স্বাদকে বাদ না দিয়েও চিনি বর্জনের এ এক দারুণ উপায়!
এভাবে ধাপে ধাপে এগোনোর মাধ্যমে চিনি বর্জন হবে টেকসই। কয়েক সপ্তাহ পরে অবাক বিস্ময়ে দেখবেন, চিনি আর আপনাকে আগের মতো টানছে না!