আমাদের অতীত কতটা সমৃদ্ধ ছিল? কী করলে আমরা আবারো বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় জাতি হবো?

published : ২৫ মার্চ ২০২৬

একাত্তরে যুদ্ধবিধ্বস্ত আর বছরের পর বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর ঘুরে দাঁড়াতে মরীয়া এই বাংলার যে সুখ-সমৃদ্ধির এক মহান ইতিহাস আছে তা কি জানেন?

আমরা ছিলাম ধনী জাতি!

হাজার বছর আগে বিশ্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী অঞ্চলগুলোর একটি ছিল এই বাংলা। প্রাচুর্যের দিক থেকে আমরা ছিলাম বিশ্বের ৬ষ্ঠ সমৃদ্ধ জাতি। ওয়ার্ল্ড জিডিপিতে বাংলার একার অবদান ছিল ১২ শতাংশ; যেখানে ইংল্যান্ডের জিডিপি অবদান ছিল মাত্র ১ শতাংশ! 

তৎকালীন বঙ্গের রাজধানী গৌড়ের ধন-সম্পদ দেখে মুঘল সম্রাট হুমায়ুন এতটাই বিস্মিত হন যে এর নামকরণ করেন জান্নাতাবাদ। 

শিল্পে সমৃদ্ধ বাংলা 

এককালে বাংলায় তৈরি নানারকম কাপড় রোম, মিশর, জাভাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে রপ্তানি হতো। বস্ত্রশিল্পে বাংলার সুখ্যাতি ছিল বিশ্বজোড়া। ১৮ শতকে বাংলায় প্রায় ১৫০ রকম কাপড় তৈরি হতো।

সবচেয়ে বেশি বলতে হয় মসলিনের কথা। রোম সম্রাটসহ বিশ্বের রাজা বাদশাদের সবচেয়ে প্রিয় কাপড় ছিল বাংলার মসলিন।  

এছাড়াও, বাংলায় গড়ে উঠেছিল জাহাজ, কার্পেট, কাগজ, ইস্পাত, লবণ প্রভৃতি শিল্প। 

আমরা ছিলাম বিশ্ববাণিজ্যে পটু

বাংলার সওদাগররা নিজেদের তৈরি জাহাজে করে শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, এডেন, বসরা, মাদাগাস্কার, আন্দামান, নিকোবর, পেনাং, বালী, বোর্নিও, সুমাত্রা, সাংহাই প্রভৃতি স্থানে যেতেন বাণিজ্য করতে। 

আবার আরব, পারস্য, ভারতবর্ষ, আবিসিনিয়া থেকেও বড় বড় বাণিজ্য জাহাজ আসত বাংলায়, এখান থেকে পণ্যদ্রব্য নিয়ে যেত করমন্ডল, মালাবার, পেগু, সুমাত্রা, সিংহল প্রভৃতি অঞ্চলে।

বাংলার সুতিকাপড়, রেশমি বস্ত্র, চাল, চিনি, আদা, তামাক, পাট ইত্যাদি রপ্তানি হতো বিভিন্ন দেশে।  

নীতি-নৈতিকতায় অগ্রসর বাংলা

আমাদের পূর্ব পুরুষরা ছিলেন ধার্মিক, ন্যায়পরায়ন, মহানুভব ও দয়ালু। 

ইতিহাসবিদ সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, চীনাদের লেখা বইগুলোতে আছে, তারা বাঙালিকে দুটো সার্টিফিকেট দিয়েছিল- এক. তারা মিথ্যা বলে না। দুই. কারো সাথে প্রতারণা করে না।

ময়নামতি, পাহাড়পুর, মহাস্থানগড়, জগদ্দল বিহার দুই হাজার বছর আগের এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ছিল জ্ঞান ও ধর্মচর্চার কেন্দ্র, যা সবসময় মুখরিত থাকতো দেশ বিদেশের জ্ঞান পিপাসুদের কলরবে। 

৬ষ্ঠ সমৃদ্ধ থেকে হতদরিদ্র কীভাবে 

বাংলার সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল জনসংখ্যা। ৩ কোটি মানুষের এই জাতিকে শোষণ করা অসম্ভব বুঝতে পেরে শাসনভার গ্রহণের অল্পকাল পরই ব্রিটিশরা ঘটায় পরিকল্পিত দুর্ভিক্ষ। ১৭৭০ সালে (বাংলা বর্ষ ১১৭৬) সংঘটিত ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ নামে পরিচিত ভয়াবহ সেই দুর্ভিক্ষে মারা যায় ১ কোটি মানুষ।   

বাংলার রাজকোষ থেকে যে লুটপাট তারা চালিয়েছিল তার পরিমাণ ছিল ৪০ বিলিয়ন ডলার! বাংলা
ছাড়ার সময় লুণ্ঠিত ধনরত্ন মণিমাণিক্য নিয়ে যাওয়ার জন্যে তাদের লেগেছিল তিনটি জাহাজ!

ইংরেজরা আসার আগে যে বাংলা ছিল বিশ্বের ৬ষ্ঠ সমৃদ্ধশালী অঞ্চল, তারা এই দেশ ছেড়ে যাওয়ার সময় সেটাই পরিণত হয় বিশ্বের দরিদ্র অঞ্চলে।

আবারো ঘুরে দাঁড়াব আমরা

সত্তরের দশকে বিশ্বব্যাংকের তৎকালীন প্রধান অর্থনীতিবিদ বলেছিলেন, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় প্রতিবছর যদি দুই শতাংশ হারে বাড়ে তবুও মানসম্পন্ন মাথাপিছু আয়ের তালিকায় যেতে বাংলাদেশের ১২৫ বছর লাগবে। তিন শতাংশ হারে বাড়লে লাগবে ৯০ বছর।

৯০ বছর লাগে নি! ৪৫ বছরের মাথায় বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম বাংলাদেশ সম্পর্কে মন্তব্য করলেন, “I can see a bright future for the people of this country!” 

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিয়ে এখন উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদ এবং বিশ্বনেতাগণ। বাংলাদেশকে বলা হচ্ছে Next Eleven-এর একটি। Next Eleven হলো এমন ১১টি দেশ যারা আগামীতে অন্যতম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশে পরিণত হবে।

সম্ভাবনা কতখানি?

ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের জিডিপি আকার হবে ১ ট্রিলিয়ন ডলার। 

আমেরিকান কনসাল্টিং ফার্ম Boston Consulting Group (BCG) বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনশক্তির গড় বয়স মাত্র ২৮ বছর উল্লেখ করে বলছে, বাংলাদেশের যে যোগ্য জনশক্তি রয়েছে তা দিয়ে দেশটি তার প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক দ্রুত এগিয়ে যেতে পারবে।   

আর কোয়ান্টাম শুরু থেকে বলছে আমরা আবারো পরিণত হবো বিশ্বের শ্রেষ্ঠ দশ জাতির একটিতে। কারণ একজন মানুষ শুধু মুখ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে না, মস্তিষ্ক নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। মস্তিষ্ক যখন কাজ করবে, আমাদের প্রাচুর্য থামিয়ে রাখতে পারবে না কেউ।

তাই আসুন আমাদের সুমহান ইতিহাস নিয়ে যা জানলাম তাকে অন্তরে ধারণ করি। দেশকে শীর্ষস্থানীয় সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে ভাবি। নিজের কাজ করি সবচেয়ে ভালোভাবে। 

আমাদের সম্মিলিত ভাবনা এবং কাজই ফিরিয়ে আনবে আমাদের হারানো সমৃদ্ধি।