
published : ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
সন্তান লালন- বেশিরভাগ মানুষ মনে করেন সন্তানকে খাইয়ে পড়িয়ে বড় করার নামই বুঝি লালন! কিন্তু প্যারেন্টিং বা সন্তান লালন বিষয়টি আসলে আরো ব্যাপক!
এক কথায়, সন্তানকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে যোগ্য, দায়িত্বশীল, আত্মনির্ভরশীল, পরিজন ও প্রিয়জনের ব্যাপারে মনোযোগী ও ভালো মানুষ তথা সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার বিজ্ঞানসম্মত প্রক্রিয়াই হলো প্যারেন্টিং বা সন্তান লালন। সন্তান হওয়ার পর নয়, যার সূচনা হওয়া উচিৎ সন্তান জন্মানোর আগে থেকে, যখন সে ভ্রূণাবস্থায় থাকে।
অর্থাৎ, যখন কোনো দম্পতি জানতে পারলেন তারা বাবা-মা হচ্ছেন প্যারেন্টিং শুরু করতে হবে তখন থেকে।
বাস্তবতা হলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা প্যারেন্টিং করতে যাই ছেলেমেয়ে বড় হওয়ার পরে, যখন তাকে আর কথা শোনানো যাচ্ছে না। তখন আমরা ভাবতে বসি কীভাবে তাকে কথা শোনানো যায়! অথচ যখন সে ছোট ছিল, বাবা মায়ের কথা শুনতে চাইত তখন আমাদের না সময় ছিল তাকে কথা শোনানোর, না তার সাথে কথা বলার!
আধুনিক বিজ্ঞান বলে, গর্ভাবস্থায় মায়ের কাছ থেকে তথ্য চলে যায় সন্তানের ডিএনএ-তে। বিভিন্ন গবেষণায় চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে, বাচ্চা যখন গর্ভে থাকে তখন সে সবকিছু শোনে ও বোঝে, প্রভাবিত হয় মায়ের মুড, চিন্তা চেতনা, দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে। মা যা চিন্তা করে গর্ভের সন্তান তা অনুভব করতে পারে।
মা যদি আনন্দে থাকেন, বাচ্চার মধ্যে সে আনন্দের অনুভূতি সঞ্চারিত হয়, মা কষ্টে থাকলে তার মধ্যে সঞ্চারিত হয় কষ্টের অনুভূতি।
গবেষণায় দেখা গেছে, ড্রামের হঠাৎ উচ্চ শব্দে গর্ভস্থ শিশু লাফিয়ে উঠছে, রক মিউজিক শুনে বার বার মায়ের পেটে লাথি মারছে। উচ্চ শব্দ তাকে উত্তেজিত করে। আবার হাল্কা মিউজিক শুনে সে শান্ত হয়ে যায়।
অর্থাৎ, একজন সন্তানসম্ভবা মা কী বলছেন বা তার চারপাশে কে কী বলছে তা গর্ভস্থ সন্তান শুনতে পায় এবং এই কথাগুলো তার ব্রেনে গেঁথে যায়। কাজেই ভালো মানুষ হওয়া এবং জীবনে বড় কিছু করতে পারার বিশ্বাস সন্তানের মধ্যে সঞ্চারিত হয় গর্ভাবস্থায়ই। আর তাই একজন মায়ের উচিৎ গর্ভস্থ সন্তানের মধ্যে বড় মানুষ হওয়ার বিশ্বাস সঞ্চার ও লালন করা।
১. বেশি বেশি ধর্মগ্রন্থ পড়ুন; ধর্মবাণী শুনুন। এতে নৈতিক এবং ধর্মীয় চেতনা ও অনুভূতি বাচ্চার মধ্যে প্রবেশ করবে।
২. সবসময় ইতিবাচক থাকুন ও ইতিবাচক কথা বলুন। ঘরে কোনো নেতিবাচক কথা বলবেন না, ঝগড়াঝাঁটি করবেন না। আপনার চিন্তা ও কাজ যত ভাল হবে তত ভাল হবে আপনার সন্তান।
৩. অধিকাংশ ক্ষেত্রে সন্তানদের মধ্যে অস্থিরতা ও বিষণ্নতার কারণ সন্তানসম্ভবা মায়ের মধ্যে উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা ও বিষণ্নতা। কারণ যখন সন্তান গর্ভে আসে, তখন মায়ের কিছু শারীরিক-মানসিক পরিবর্তন হয়। এসময়ে মা যদি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত বা উত্তেজিত হন তাহলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে গর্ভস্থ সন্তানের ওপর। কাজেই প্রসূতির আশেপাশে যারা থাকবেন—শ্বশুর-শাশুড়ি, স্বামী, ননদ, তাদের কর্তব্য হচ্ছে প্রসূতিকে সবসময় উৎফুল্ল রাখা। প্রসূতি যত উৎফুল্ল থাকবে বাচ্চা হবে তত বুদ্ধিমান, খোশমেজাজী এবং প্রজ্ঞাবান।
৪. অলি-বুজুর্গ, মুনি-ঋষি বা সফল মানুষদের কথা স্মরণ করতে পারেন, যাদের মতো সন্তান আপনি চান। ভ্রূণ থেকে শুরু করে গর্ভাবস্থার পুরো সময় এই মানুষদের আদর্শ, গুণ আপনার ভাবনার মধ্যে রাখুন, তাদের জীবনী ও লেখা পড়ুন।
৫. গর্ভস্থ শিশু মায়ের ভাষার শব্দ তরঙ্গ গ্রহণ করতে পারে। তাই গর্ভস্থ শিশুর সাথে কথা বলুন, তাকে জানান আপনি তাকে কতটা প্রত্যাশা করছেন, কী কী গুণ আপনি তার মধ্যে দেখতে চান। তাকে স্বপ্ন দিন বড় হয়ে সে কী হবে। আপনি দেখবেন, ভ্রূণ থাকা অবস্থায় যে চিন্তাগুলো করেছেন, ছোট থেকেই আপনার সন্তানের ঝোঁক সেই দিকে যাবে।
৬. মেডিটেশন- দূষিত পরিবেশ ও খাবার থেকে প্রসূতি মাকে যেমন দূরে থাকতে হবে তেমনি মনকে মুক্ত রাখতে হবে দূষিত চিন্তা থেকে। আর মন ভালো ও প্রশান্ত রাখার জন্যে মেডিটেশনের বিকল্প নেই।
গবেষণায় দেখা গেছে, যে মায়েরা গর্ভাবস্থায় শিথিলায়ন করেন তাদের জরায়ুতে রক্তের প্রবাহ ভালো হয়। তাই গর্ভাবস্থায় শিথিলায়ন মেডিটেশনটি নিয়মিত চর্চা করুন। পাশাপাশি মনছবি, শুকরিয়া বা আনন্দের মেডিটেশন করতে পারেন।
৭. যতদিন পারা যায় সাদাকায়নে অংশ নিন। সাদাকায়নের ইতিবাচক পরিবেশ মায়ের এবং গর্ভস্থ শিশুর ওপর শুভ প্রভাব ফেলবে।
৮. যখনই সময় পান এই অটোসাজেশনটি চর্চা করুন- ‘আমার সন্তান সুস্থ হবে, সুন্দর হবে, মেধাবী হবে, ভালো হবে, আমার সন্তান স্বাভাবিকভাবে ভূমিষ্ঠ হবে’
৯. বেশি বেশি দোয়া করুন। হযরত ইবরাহিম (আ)-এর এই দোয়াটি করতে পারেন-
‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সৎকর্মশীল সন্তান দান করো’ (সূরা সাফফাত : ১০০)।
১০. হরর মুভি বা যেসব মুভি ও টিভি সিরিয়াল টেনশন সৃষ্টি করে, সেগুলো দেখবেন না। এমন বই বা খবরও পড়বেন না। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ব্যবহার করবেন না।
আপনার এই ছোট ছোট কাজ বা অভ্যাস আপনার সন্তানের মধ্যে বপন করবে অনন্য মানুষের বীজ, যা ফল দিয়ে যাবে জীবনভর!
হ্যাপি প্যারেন্টিং!