
published : ৮ মার্চ ২০২৬
এক মহীয়সী নারীর হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এমন একটি শিক্ষাকেন্দ্র, যেখানে পড়াশোনা করেছেন অনেক বিশ্বনন্দিত জ্ঞানী মানুষ। বলছি মরক্কোর ইউনিভার্সিটি অফ আল ক্কারাউইনের কথা। সমাজবিজ্ঞানের জনক ইবনে খালদুন, দার্শনিক ইবনে রুশদ, ইতালীয় রেনেসাঁ দার্শনিক ও মানবতাবাদী জিওভান্নি পিকো এবং বেশ ক’জন ইউরোপীয় স্কলার এই শিক্ষাঙ্গন থেকেই জ্ঞানার্জন করেছিলেন।
যার ভাবনা থেকে গড়ে ওঠে বিশ্বের প্রাচীনতম এবং অদ্যাবধি কার্যরত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, তিনি হলেন মধ্যযুগের মুসলিম মনীষা ও শিক্ষাবিদ ফাতেমা আল-ফিহরি (Fatima al-Fihri)।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসে আজ আমরা জানব আরব ইতিহাসের এই অনন্য মুসলিম নারী ও তার প্রতিষ্ঠিত ইউনিভার্সিটি অফ আল ক্কারাউইন সম্পর্কে।
ফাতেমা আল-ফিহরি জন্মগ্রহণ করেন বর্তমান তিউনিসিয়ার ক্বারউইনে আনুমানিক ৮০০ খ্রিস্টাব্দে। পরবর্তীতে তিনি সপরিবারে অভিবাসিত হন মরক্কোর ফেজে। তার পিতা মুহাম্মদ আল-ফিহরি ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী। ধর্মপ্রাণ, শিক্ষানুরাগী ও দানশীলতায় বিশ্বাসী ছিলেন তিনি।
ফাতিমা আল-ফিহরি এবং তার বোন মারিয়াম আল-ফিহরি ক্লাসিকাল আরবি ভাষা, ইসলামিক ফিক্হ এবং হাদীস শাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করেন।
প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর ফেজ শহরেই ফাতেমার বাবা তাকে বিয়ে দেন। কিন্তু বিয়ের অল্প সময়ের মধ্যেই তার বাবা, ভাই এবং স্বামী মৃত্যুবরণ করেন। রয়ে যান কেবল বোন মারিয়াম।
বাবার রেখে যাওয়া বিপুল পরিমাণ সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন দুই বোন। তরুণ বয়সী ফাতিমা এবং মারিয়াম ইচ্ছে করলেই এই সম্পত্তি সাজসজ্জা কিংবা বিলাসী পণ্যের পেছনে ব্যয় করতে পারতেন; কিন্তু তারা তা করেন নি।
ছোটবেলাতেই তারা শিখেছিলেন, জ্ঞানই মানবতার সত্যিকার শক্তি। আর তাই তারা সিদ্ধান্ত নেন, এই অর্থ-সম্পদ ব্যয় করবেন ধর্ম, মানবকল্যাণ ও শিক্ষার জন্যে।
মধ্যযুগে মুসলিম বিশ্ব ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন, আইন ও শিল্পকলার এক উর্বর কেন্দ্র। বাগদাদ, কায়রো, কর্ডোভা ও ফেজ—এই নগরগুলোতে গড়ে উঠছিল অনেক মসজিদ। মসজিদগুলো কেবল উপাসনালয় নয়; ছিল পাঠদান, পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণ ও গবেষণার কেন্দ্রও। শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসব নগরে এসে জ্ঞানার্জন করত এবং পরবর্তীতে নিজ অঞ্চলে সেই জ্ঞান ছড়িয়ে দিত।
তৎকালীন সমাজে ‘ওয়াকফ’ বা দানপ্রথার মাধ্যমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পাঠাগার ও শিক্ষকদের ব্যয় নির্বাহ করা হতো। নারী-পুরুষ উভয়েই অংশ নিতেন ওয়াকফে।
সেই সময়ে জ্ঞানার্জনে ফেজের খ্যাতি দিন দিন বেড়েই চলছিল। দেশ-বিদেশ থেকে মুসল্লিরা এসে শহরটিতে বসবাস শুরু করলেন। ফাতিমা এবং মারিয়াম খেয়াল করলেন, ফেজের কেন্দ্রীয় মসজিদটিতে শহরের ক্রমবর্ধমান মুসল্লিদের স্থান সঙ্কুলান হচ্ছে না। তারা সিদ্ধান্ত নেন, বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তি দিয়ে তারা পৃথক দুটি মসজিদ নির্মাণ করবেন।
৮৫৯ সালে মারিয়াম নির্মাণ করেন আন্দালুস মসজিদ এবং ফাতিমা নিজের সব সম্পত্তি উজাড় করে নির্মাণ শুরু করেন আল-ক্বারাউইন মসজিদ।
ইতিহাসবিদ ইবনে আবি-জারার বিবরণ থেকে জানা যায়, ফাতিমা মসজিদ নির্মাণের জন্যে প্রথমে জমি ক্রয় করেন এবং পবিত্র রমজান মাসের এক শনিবার মসজিদ নির্মাণের কাজ শুরু করেন।
তিনি অর্থ দান করেই নিজের দায়িত্ব শেষ করেন নি। সার্বক্ষণিকভাবে উপস্থিত থেকে নির্মাণকাজ তদারকি করেছিলেন। শুরু থেকে শেষ হওয়া পর্যন্ত প্রতিদিন রোজা রেখেছিলেন।
মসজিদটির নির্মাণকাজ শেষ হয় ৮৬১ সালে। নির্মাণ শেষে তিনি সেখানে নামাজ আদায় করে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। জন্মভূমির নামানুসারেই মসজিদটির নাম রাখেন- আল ক্বারাউইন মসজিদ।
ফাতিমা পরবর্তীতে এই মসজিদেরই বর্ধিতাংশে একটি মাদ্রাসা নির্মাণ করেন। এর স্থাপত্যে ব্যবহৃত হয়- স্থানীয় ফেজের পাথর, ইট এবং চুনাপাথর, যা তৎকালীন আফ্রিকান ইসলামী স্থাপত্যের পরিচিতি বহন করত।
একটি মিনারেট, প্রার্থনা হল ও উঠোন দিয়ে যে মাদ্রাসা যাত্রা শুরু করেছিল, পরবর্তীতে সেটাই সম্প্রসারিত হয় বিশ্ববিদ্যালয় আকারে। ৯ম-১২শ শতাব্দীর দিকে এর সম্প্রসারণে অবদান রাখেন বিভিন্ন খলিফা ও স্থানীয় শাসকরা। সে-সময় শিক্ষার্থীদের জন্যে আবাসন, ধ্যানকক্ষ, লাইব্রেরি, ফোয়ারা ও জলাশয় তৈরি করা হয়।
শুরুর দিকে এই শিক্ষালয়ে কোরআন শিক্ষাদান, ইসলামী তত্ত্ব ও মৌলিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের পাঠ হতো। বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের পর সেখানে ইসলামী শিক্ষার পাশাপাশি ব্যাকরণ, গণিত, চিকিৎসাশাস্ত্র, জ্যোতির্বিদ্যা, ইতিহাস, রসায়ন, ভূগোলসহ বিভিন্ন বিষয়ে পাঠদান শুরু হয়।
বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন একটি লাইব্রেরি রয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে আছে ইবনে খালদুনের ‘মুকাদ্দিমা’সহ ৪ সহস্রাধিক পাণ্ডুলিপি।
বৈচিত্র্যময় বিষয়ের ওপর আনুষ্ঠানিক শিক্ষার জন্যে ডিগ্রী প্রদানকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আল ক্বারাউইনই বিশ্বের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়, যা এখনও টিকে আছে। এবং গত সাড়ে ১১শ বছর ধরে মানুষকে আলোকিত করে আসছে।
ফাতিমা নিজেই লেখাপড়া করেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখানে লেখাপড়া করতে পারত সকল ধর্মের মানুষ। পোপ দ্বিতীয় সিলভেস্টার এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ইহুদি চিকিৎসাবিদ দার্শনিক ও আরবী ভাষায় দক্ষ পণ্ডিত মায়মোনাইডস এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন।
প্রতিষ্ঠানটি তখকার সময়ে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপীয় শিক্ষার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেছিল।
ইতিহাস বলছে, ফাতিমা আল ফিহরির এই মহতী উদ্যোগ কেবল ধর্মীয় শিক্ষা নয়, সমাজ সংস্কারেরও ইঙ্গিত দেয়। ওয়াকফ কীভাবে সময়ের বাধা অতিক্রম করে জ্ঞান ও সভ্যতার ওপর চিরস্থায়ী ছাপ রাখতে পারে তিনি এর অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন।
অক্সফোর্ড এবং কেমব্রিজ- বিশ্বের সবচেয়ে নামকরা এবং প্রাচীন এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতিষ্ঠিত হয় যথাক্রমে ১০৯৬ ও ১২০৯ সালে। তবে পুরো বিশ্বের তো বটেই, এগুলোর কোনোটিই ইউরোপেরও প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না। ইউরোপের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়, ইতালির বোলোগনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১০৮৮ সালে। আল ক্বারাউইন পুরনো এরচেয়েও ২২৭ বছরের!
ইউনেস্কো এবং গিনেজ বুক অফ ওয়ার্ল্ডের রেকর্ড অনুযায়ী এটিই বিশ্বের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় এবং ডিগ্রী প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, যা এখন পর্যন্ত একটানা চালু আছে। আর পুরুষ নয়, এই ঐতিহাসিক বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একজন মুসলিম নারী!
৪৭৬-১০০০ খ্রিষ্টাব্দ, ইতিহাসে যেটা ইউরোপের জন্যে ‘অন্ধকার যুগ’, জ্ঞানবিজ্ঞানের উৎকর্ষতায় সেটাই ছিল ইসলামিক গোল্ডেন এজ বা ইসলামের সোনালী যুগ। সেসময় আরব বিশ্বে পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও যে আত্মবিকাশের অগাধ স্বাধীনতা লাভ করেছেন তার অন্যতম দৃষ্টান্ত ফাতিমা আল ফিহরি।
এই অনন্য শিক্ষানুরাগী ইন্তেকাল করেন মরক্কোর ফেজ শহরে আনুমানিক ৮৮০ খ্রিস্টাব্দে। নারী দিবসে তার প্রতি আমরা জানাই অগাধ শ্রদ্ধা।