শিশুসন্তানকে রোজার প্রকৃত ধারণা দেবেন যে উপায়ে

published : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

রমজান আসন্ন। ধর্মপ্রাণ মুসলমান হিসেবে আপনি নিশ্চয়ই রোজা রাখবেন। হয়তো ইতিমধ্যে রোজার প্রস্তুতি নিতে শুরুও করেছেন। ঘরে যদি শিশু সন্তান থাকে, তাহলে সে-ও হয়তো রোজা রাখতে চাইবে- আপনাকে দেখে কিংবা জ্যেষ্ঠ ভাইবোন, বন্ধুবান্ধব বা কাজিনদের সাথে পাল্লা দিয়ে। তাকে না করবেন না। বরং এখন থেকেই তাকে অভ্যস্ত করুন রোজা রাখতে।

শিশুকে রোজার ব্যাপারে যে ধারণা দিতে হবে

পাঁচ থেকে সাত বছর বয়সে শিশু নিয়ম বুঝতে শেখে, কিন্তু আত্মনিয়ন্ত্রণ (self-control) পুরোপুরি তৈরি হয় না। তাই এ বয়সে রোজা পালন করাতেই হবে তা নয়; বরং, রমজান ও রোজাকে জানা এবং বোঝানোটাই গুরুত্বপূর্ণ।

রোজা মানে সংযম। তবে এই সংযম শুধু না খেয়ে থাকা নয়; দুর্ব্যবহার, গীবত, উত্তেজনা/অসহিষ্ণুতা, প্রতারণাসহ সকল অন্যায় ও ক্ষতিকর কাজ ও অভ্যাস থেকে বিরত থাকাও রোজার সংযম। এই শিক্ষাটি শিশুকে অল্প বয়স থেকেই একটু একটু করে দেয়া শুরু করুন।

তবে তাকে রমজান মানে যদি ‘ক্ষুধা, কষ্ট ও বাধ্যবাধকতা’ হিসেবে বোঝান, তবে এটি তার অপরিপক্বমনে ধর্ম নিয়ে ভয় ও অপরাধবোধ তৈরি করতে পারে। তাই রমজান মাসটিকে ভালো মানুষ বা আল্লাহর প্রিয় হওয়ার সময় হিসেবে শেখানো উচিৎ, যা শিশুর নৈতিক ও আবেগিক বিকাশে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

শিশুকে রোজায় অভ্যস্ত যেভাবে করবেন 

১. রোজাকে আনন্দদায়ক হিসেবে উপস্থাপন করুন

আমরা অনেকেই এই ভুলটা করি, শিশুকে প্রথমেই শেখাই- রোজা মানে পুরোটা দিন না খেয়ে থাকতে হবে। কিন্তু শিশুর কাছে রোজা যদি কেবল ‘খাওয়া বন্ধ দিবস’ হয়, তাহলে শিশুর ব্রেন-মনে এই তথ্য পৌঁছায় যে- ‘রোজা মানেই কষ্ট, সারাদিন না খেয়ে থাকতে হয়’!

পরকালীন বিশাল পুরস্কার আর ইহকালীন ফিটনেস লাভের এই মহান কাজটি যত আনন্দিতচিত্তে করা যায় তত মঙ্গল। শিশুকেও এই ধারণাই দিন যে রোজা রাখা আনন্দের কাজ। তবে সে যেহেতু বয়সে এখনো ছোট, তাই যতটুকু সময় সে পারবে ততটুকু সময় রোজা রাখলেই হবে। আল্লাহ এতেই অনেক খুশি হবেন।

২. শুরু করুন অল্প অল্প করে 

অল্পবয়সী শিশুদের শরীর পূর্ণ রোজার জন্যে প্রস্তুত থাকে না। তাই তাকে পুরো রোজা রাখতে বাধ্য করা শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিকর হতে পারে। বরং এভাবে বলুন- তুমি আজ সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রোজা রাখার চেষ্টা করবে। 

পূর্ণদিন রোজা রাখতে না পারলেও সেটাকে পূর্ণদিন রোজা হিসেব করে তাকে মাঝেমধ্যে মনে করিয়ে দিন সে এতগুলো রোজা করেছে।     

রোজাদারকে ইফতার করানো অনেক সওয়াবের কাজ। তাই রোজা রাখতে পারুক বা না পারুক, তাকে উদ্বুদ্ধ করুন ইফতার পরিবেশনে সহায়তা করতে। বেশি কিছু না, প্লেটটা এগিয়ে দেয়া, খেজুর ধুয়ে দেয়া, পানি ঢেলে দেয়া এসবই।

৩. রোজাকে শুধু ‘না খেয়ে থাকা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করবেন না

তাদেরকে তাদের ভাষায় বোঝান যে, রোজার একটা বড় শিক্ষা হলো আত্মনিয়ন্ত্রণ করতে শেখা। যেমন- রাগ না করা, মিথ্যা না বলা, ঝগড়াঝাটি-মারামারি না করা এবং সমমর্মী ও ভালো মানুষ হওয়া।

বানান করে পড়ার বয়স হলেই তার হাতে কোরআন বাংলা মর্মবাণী তুলে দিন। পড়ে হয়ত সবটা বুঝবে না, কিন্তু কোরআনের কথাগুলো তার মনে গেঁথে যাবে।

মাটির ব্যাংকে দানসহ আপনি যা দান করবেন তাতে তাকেও শরীক করুন, দানটা করুন তার হাত দিয়ে।

৪. ভয় দেখাবেন না 

রোজা না রাখলে আল্লাহ রাগ করবেন, শাস্তি দেবেন, গুনাহ দেবেন এমন কথা বলবেন না। 

বরং বলুন—আল্লাহ আমাদের খুব ভালবাসেন, তাই তিনি আমাদের ভালো চান, ভালো কাজে দেখতে চান এবং সুস্থ ও প্রাণবন্ত রাখতে চান। তাই তিনি রমজানে রোজা রাখতে বলেছেন। 

৫. গল্পের মাধ্যমে বোঝান 

৫-৭ বছর বয়সীরা গল্প ও কল্পনার মাধ্যমে বেশি শেখে। তাই রমজানের আমল বিষয়ে ধারণা দিতে নবীজীর (স) দানের ঘটনা, সাহায্যের গল্প, যাকাতের ঘটনা শোনাতে পারেন যা তার কচিমনে দাগ কাটবে। এ ধরনের গল্প থেকে সে শিখবে, শুধু অভুক্ত থাকাই নয়, রোজা রেখে অন্যকে সাহায্য করাও রমজানের শিক্ষা।    

৬. পুরস্কার নয়স্বীকৃতি দিন

রোজা রাখলে খেলনা পাবে, চিপস পাবে, যা চাইবে তাই পাবে- এ ধরনের শর্ত শিশুকে রোজার অন্তর্নিহিত অর্থ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। প্রলোভন দেখিয়ে কখনো রোজার সৌন্দর্যকে নষ্ট করবেন না। বরং এভাবে বলুন- তুমি আজ রোজা রেখে খুব ভালো কাজ করেছ। আল্লাহ তোমাকে এর উত্তম প্রতিদান দেবেন।

৭. রোজা রাখতে না পারলে লজ্জা দেবেন না

কোনো কোনো বাবা-মা সন্তানকে বলেন- তোমার বয়সে আমি সারাদিন রোজা রাখতাম। আর তুমি একটাও রোজা রাখতে পারো না! 

এভাবে বললে শিশু আত্মবিশ্বাস হারায়। রোজার প্রতি আগ্রহ কমে যায়। তাই এভাবে বলুন- আজ না পারলেও সমস্যা নেই, তুমি চেষ্টা করো, পারবে।

৮. নামাজ ও দোয়ার ছোট অভ্যাস তৈরি করুন

ধীরে ধীরে নামাজ শেখানোর প্রস্তুতি হিসেবেও এই মাস উত্তম। আপনি তাকে নিজের সঙ্গে নামাজে দাঁড়ানো, মোনাজাতে হাত তোলা, স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এবং ছোট ছোট সূরা শেখান।  

ইফতারের আগে তাকে সাথে নিয়ে আল কোরআনের দোয়া শুনুন। দোয়া পড়তে উৎসাহ দিন। 

এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলোই তাকে ধর্মের সাথে সংযুক্ত করবে। 

৯. ঈদকে রমজানের উপহার হিসেবে উপস্থাপন করুন 

ঈদ মানেই শিশুদের কাছে নতুন জামা পড়ার দিন। কিন্তু কেন? কারণ এক মাস রোজা পালনের মাধ্যেম নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা, অন্যের কষ্ট বোঝা, গীবত বর্জন করা, মিথ্যা ও রাগ কমানোর চেষ্টা করার বিনিময়ে উপহার হিসেবে আল্লাহ আমাদের ঈদ উপহার দিয়েছেন। 

এভাবে ব্যাখ্যা করে বললে উৎসবের আনন্দ শুধু বাহ্যিক থাকে না, বরং তা শিশুর অন্তরে নৈতিক শিক্ষা ও আত্মশুদ্ধির অনুভূতি জাগ্রত করবে।

সবশেষে বলা যায়, একটি শিশু গল্প শুনে, ইফতার করে, দোয়া পড়ে, অভাবীকে খাবার দিয়ে সাহায্য করলে সে শুধু রোজা শিখবে না, শিখবে ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য।

এই বয়সে যদি রমজান হয় ভালো লাগার অভিজ্ঞতা, তাহলে আরেকটু বড় হয়ে সে একদিন নিজের ইচ্ছায় বলবে- “আমি পুরো রোজা রাখব!”