
published : ২৪ আগস্ট ২০২৬
এতিম- শুনলেই কি চোখের সামনে ভেসে ওঠে অভিভাবকহীন ধূলিমলিন শিশুর মুখ, যার জীবন কাটে পথে পথে, গোত্তা খেয়ে খেয়ে? শিক্ষার সুযোগ না পেয়ে আর নানান বঞ্চনা নিয়ে বেড়ে উঠে একটা সময় যে পরিণত হয় সমাজের বোঝায়?
🎬 কোয়ান্টাম এতিমান কার্যক্রম (প্রমো ভিডিও)
বাংলায় যাকে আমরা ‘এতিম’ বলি তা আরবিতে ‘ইয়াতিম’। যার ভাষাগত অর্থ হলো uniqueness বা অনন্যতা। পবিত্র কোরআনের ২২টি আয়াতে ২৩ বার এসেছে ‘ইয়াতিম’ কথাটি।
আল্লামা রাগিব ইস্পাহানি- কোরআনের ভাষাগত তফসিরের ক্ষেত্রে বিশ্বের প্রথমসারির একজন আলেম। তিনি কোরআনে ‘ইয়াতিম’ শব্দটির প্রয়োগ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন- “এতিম হলো সেই অনন্য মূল্যবান রত্ন, যা তার উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে”।
‘দুররাহ ইয়াতিম’ শব্দটি ব্যবহার করা হয় পার্ল বা মুক্তার ক্ষেত্রে। মহামূল্যবান মুক্তা, যা ঝিনুকের মধ্যে থাকলে বিকশিত হতে পারত, তার উৎকর্ষ থেমে যায় ঝিনুক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কারণে।
একই অবস্থা হয় এতিমেরও। যে অভিভাবকত্বের ছায়ায় তার সম্ভাবনা বিকশিত হতে পারত, তা না পাওয়ায় অপূর্ণ থেকে যায় তার বিকাশ। অথচ একটু যত্ন আর সমর্থন পেলে কী অসাধারণ কিছু তার দ্বারা করা সম্ভব তা ইতিহাসের দিকে তাকালেই আমরা বুঝতে পারি।
খোরাসানের এক দরিদ্র পিতা মৃত্যুশয্যায় তার বন্ধুর হাতে তার সমুদয় সঞ্চয় তুলে দিয়ে তার নাবালক সন্তান দুটোর লেখাপড়ার ব্যবস্থা করতে বললেন। বন্ধুটি তা-ই করল।
কিছুদিন পর বন্ধুর দেয়া সঞ্চয় ফুরিয়ে গেল। বন্ধুটি রখন ছেলে দুটোকে পাঠিয়ে দিলেন তুসের এক মাদ্রাসায়। বিনামূল্যে থাকা-খাওয়া-লেখাপড়ার সুযোগ পেয়ে শুধু বয়সে না, জ্ঞানগরিমায়ও বড় হলো তারা। পরবর্তী জীবনে তখনকার দিনের সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয় মাদ্রাসা নিজামিয়াতে দুইজনই প্রধান অধ্যাপকের দায়িত্ব পালন করেছেন।
তাদেরই একজন ইতিহাসে এমনভাবে নিজের নাম লিখিয়েছেন যে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল যে তার নাম জানে না। তিনি হলেন ইমাম গাজ্জালী!
শুধু ইমাম গাজ্জালী নয়, ইতিহাসে বরেণ্য অনেক মানুষই প্রথম জীবনে ছিলেন এতিম।
আবু হুরায়রা (রা), জোনায়েদ বাগদাদী, রাবেয়া বসরী, আল বিরুনি, ইবনে খালদুন, হাফেজ সিরাজি, ওমর খৈয়াম, শেখ সাদী, এরিস্টটল, আইজ্যাক নিউটন, ফ্রেডরিখ নিটশে, লিও টলস্টয়, ফিওদর দস্তয়ভস্কি, ম্যাক্সিম গোর্কি, বার্ট্রান্ড রাসেল, এডাম স্মিথ, ম্যালকম এক্স, নেলসন ম্যান্ডেলা- এই কীর্তিমানেরাও সবাই এতিম ছিলেন।
তাই বলে হারিয়ে যান নি তারা। সামাজিক অভিভাবকত্বে তারা শুধু বেড়েই ওঠেন নি, এত বড় হয়েছেন যে ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়েছে তাদের নাম।
আসলে এতিম- এই মূল্যবান রত্ন যাতে অবহেলায় হারিয়ে না যায় সেটা নিশ্চিত করাটা নবীজীরই (স) শিক্ষা।
কোনো এক ঈদের দিন। ঈদগাহ থেকে নামাজ শেষে ঘরে ফেরার পথে তিনি দেখেন এক বালক পথে বসে কাঁদছে। ছেলেটির বাবা মারা যাওয়ার পর মায়ের আরেক জায়গায় বিয়ে হয়েছে, সেই সংসারে জায়গা হয় নি তার। শুনে নবীজী (স) ব্যথিত হলেন। ছেলেটিকে তিনি সাথে করে নিয়ে এলেন এবং স্ত্রী আয়েশাকে (রা) বললেন তাকে নিজ সন্তানের মতো পরিচর্যা করতে।
নবীজী (স) চাইলেই কিন্তু ছেলেটিকে নতুন জামাকাপড় দিয়ে, পোলাও-কোর্মা খাইয়ে বিদায় করতে পারতেন। কিন্তু তিনি অনুভব করেছেন ছেলেটির আসল প্রয়োজন- যত্ন মমতা, অভিভাবকত্বের ছায়া। সেটাই তিনি তাকে দিয়েছেন।
তার ওফাতের পর ওই এতিম শিশুটির দায়িত্ব নেন হযরত আবু বকর (রা)।
হযরত ওমর (রা) তার খেলাফতকালে এতিম এবং বিধবাদের জন্যে বাইতুল মাল থেকে মাসোহারার ব্যবস্থা করেন, যাতে তাদের চাইতে না হয়।
এতিম শিশুদের ভরণপোষণকে খলিফা হযরত আলী (রা) এত গুরুত্ব দিতেন যে তাকে বলা হতো ‘এতিমদের পিতা’!
জীবদ্দশায় জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত জোবায়ের ইবনে আওয়াম নিজে এতিম ছিলেন। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ মারা যাওয়ার পর তার সাত এতিম সন্তানের দায়িত্ব নেন তিনি।
নবীজী (স) ও সাহাবীদের দেখানো এই পথ ধরেই ৮ম নবম শতাব্দীতে বিত্তবানেরা বাগদাদ কায়রো দামেস্কে ‘দারুল ইয়াতিম’ খোলার ব্যবস্থা করেন। বাংলা করলে সেগুলো ‘এতিমখানা’-ই, তবে আর দশটা এতিমখানার মতো সেখানে এতিমেরা অবহেলিত ছিল না। তাদের বিনামূল্যে পাঠদান, পুষ্টিকর খাবার, মানসম্মত পোশাক এবং নৈতিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ছিল সেখানে। আর এর মধ্য দিয়ে এতিমখানাগুলো থেকে গড়ে ওঠেন বহু বিখ্যাত মানুষ।
এটা বুঝতে পারবেন নবীজীর (স) হাদীসগুলো থেকে। একটি হাদীসে তিনি বলেন,
আল্লাহর শপথ! দুই দুর্বল সত্তা—এতিম ও নারীদের অধিকার রক্ষায় যে-কোনো ব্যর্থতাকে আমি পাপাচার বলে ঘোষণা করছি।
- আবু শোরাইহ খোয়ালিদ (রা); নাসাঈ
অর্থাৎ, এতিমরা করুণার পাত্র নয়, যথাযথ লালন তার অধিকার; আর সামর্থ্যবানেদের দায়িত্ব সেই অধিকার রক্ষা।
আরেকটি হাদীসে তিনি বলেছেন,
আমি [নবীজী (স)] এবং একজন এতিমের দায়িত্ব গ্রহণকারী, আমরা একসাথে জান্নাতে প্রবেশ করব। (তর্জনী ও মধ্যমা একসাথে তুলে দেখিয়ে বললেন, এই দুই আঙুলের মতো) জান্নাতে একসাথে থাকব।
- সহল ইবনে সাদ (রা); বোখারী, মুসলিম
জান্নাতে তো আমরা সবাই-ই যেতে চাই, আমাদের ইহকালীন সকল সৎকর্মের উদ্দেশ্য এটাই। আর জান্নাতে সেরা মহল্লা হবে নবীজীর (স) মহল্লা। সেই মহল্লার কেন্দ্রের আশেপাশের ঘরগুলো হবে এতিমের দায়িত্ব পালনকারীদের ঘর!
জান্নাতে নবীজীর (স) আশেপাশে আরো থাকবেন সচ্চরিত্রবান মানুষ এবং আল্লাহর ইবাদত করেন যারা তারা।
একটু ভাবুন তো, পুরো জীবনে চরিত্রে কোনো দাগ পড়বে না- এটা কি এই যুগে এসে সম্ভব? আর ইবাদতেও তো শতভাগ মনোযোগ রাখতে পারি না আমরা! তাহলে নবীজীর (স) কাছাকাছি থাকার উপায়?
সবচেয়ে সহজ আর নিশ্চিত উপায় এতিমের দায়িত্ব পালন!
বলতে পারেন, এতিমকে নিজের ঘরে রেখে, তাকে নিজ সন্তানের মতো যত্ন ও মমতায় পালন আপনার জন্যে খুব কঠিন! তাহলে সহজতম রাস্তাটিই বেছে নিন!
এই ফান্ডে আপনার অর্থায়নের পর এতিমদের পরিপালনের বাকি দায়িত্ব আমাদের। কোয়ান্টাম কসমো স্কুল ও কলেজে অধ্যয়নরত প্রায় আড়াই হাজার দুঃস্থ বঞ্চিত এতিম ছেলেমেয়ের মৌলিক চাহিদা পূরণ ছাড়াও মেধাবিকাশের সর্বোচ্চ চেষ্টাই আমরা করি। আর এর মধ্য দিয়েই ওরা হয়ে উঠছে দক্ষ সফল কর্মঠ শুদ্ধাচারী ভালো মানুষ।
ক্রীড়াক্ষেত্রে পর পর ৫ বার দেশসেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হয়েছে কোয়ান্টাম কসমো স্কুল ও কলেজ। প্রত্যেক বছর জাতীয় ক্রীড়ার বেশিরভাগ পদক ওরাই জিতে নেয়। আন্তর্জাতিক জিমন্যাস্টিকসে দেশের জন্যে বয়ে আনে পদকজয়ের সম্মান।
প্রতিবছর মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে চট্টগ্রাম বোর্ডের সবচেয়ে সফল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকায় থাকে কসমো স্কুল ও কলেজ। এখান থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষে প্রথাগত কোনো ভর্তি কোচিং ছাড়াই ২০১১ থেকে এখন পর্যন্ত বুয়েট চুয়েট, সরকারি মেডিকেল ও ঢাকা চট্টগ্রাম রাজশাহী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশসেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে প্রায় ৩০০ কোয়ান্টা।
ওদের মধ্য থেকে বেরিয়ে এসেছে ইঞ্জিনিয়ার। এমবিবিএস ডাক্তার হয়ে দুঃস্থের চিকিৎসায় নিয়োজিত হয়েছে কেউ কেউ। হয়েছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকও।
অর্থাৎ, যে মহান উদ্দেশ্যে আমরা এতিমান কার্যক্রম শুরু করেছিলাম, তার ফল ফলতে শুরু করেছে। আমরা বিশ্বাস করি, একদিন ওদের মধ্য থেকেই উঠে আসবে কালজয়ী নেতা, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, উদ্ভাবক, ধর্মবেত্তা; পৃথিবীকে ঋণী করে রেখে যাবে তারা। আর তার সওয়াব সদকায়ে জারিয়া হিসেবে লেখা হতে থাকবে এতিমের দায়িত্ব গ্রহণকারী সবার আমলনামায়।
শুধু আড়াই হাজার না, আমাদের লক্ষ্য আরো অনেক বড়। সুযোগের অভাবে একটি শিশুও যেন ঝরে না যায়- আমাদের ঐকান্তিক চাওয়া এটাই।
একেকজন এতিমের জন্যে আমাদের মাসিক গড় ব্যয় ১১,৫০০ টাকা।
বিপদআপদ থেকে নিজের ও পরিবারের সুরক্ষা, মৃত বাবা-মায়ের রূহের মাগফিরাত, সন্তানের আলোকিত ভবিষ্যৎ এমন যে-কোনো নিয়তে নিন এক বা একাধিক এতিম শিশুর দায়িত্ব।
এই মুহূর্তে পুরো একজনের দায়িত্ব নিতে পারছেন না? তাহলে একজন শিশুর যে-কোনো একটি প্রয়োজন মেটানোর অর্থ দিয়ে দায়িত্ব নিন। সামর্থ্য কম বলে সঙ্কোচ করবেন না। আল্লাহ পরিমাণ দেখেন না, দেখেন সামর্থ্য আর নিয়ত। আপনি সৎ নিয়তে সামান্য একটু দিলেও আল্লাহ সেটা বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারেন।
| একেক জনের জন্যে খরচের খাত | খরচের পরিমাণ (টাকা) |
| শিক্ষা | ৫,০০০/- |
| ৩ বেলা খাবার | ৪,০০০/- |
| রোজ ১টি ডিম | ৪৫০/- |
| রোজ ১ গ্লাস সয়াদুধ | ৩০০/- |
এতিমের অভিভাবকত্ব- একে আমরা যেন স্রেফ দান দয়া করুণা হিসেবে না ভাবি, একে যেন আমরা ভাবি সুমহান দায়িত্ব। নিজের সন্তান ছাত্রাবাস বা মেসে থাকলে তার মাসিক খরচ পাঠাতে যেমন কখনো ভুল করেন না, একই আন্তরিকতায় আপনার এতিমান কন্ট্রিবিউশন মাসের শুরুতেই জমা করুন ফাউন্ডেশনে।
যদি প্রতি মাসে মনে করে পরিশোধ করা কঠিন মনে হয়, তাহলে পুরো বছরের কন্ট্রিবিউশন একসাথেও দিতে পারেন। তবু ভুল করবেন না আপনার কন্ট্রিবিউশন জমা করতে। আপনার এই আন্তরিকতাই দায়িত্ব পালনের সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
আসুন না এই সর্বাত্মক প্রয়াসে আমরা একাত্ম হই! এতিমের দায়িত্ব নিজে গ্রহণের পাশাপাশি দায়িত্ব নিতে উদ্বুদ্ধ করি প্রিয়জন-পরিচিতজনদেরও। ইনশা’আল্লাহ আমাদের সম্মিলিত প্রয়াসে গড়ে উঠবে সত্যিকার মানুষ, এগিয়ে যাবে সমাজ ও জাতি। আপনি পাবেন ইহকালীন কল্যাণ ও পরকালীন সাফল্য- জান্নাতে নবীজীর (স) কাছাকাছি থাকার অনন্য সুযোগ!