কেন আপনার যাকাত দেবেন কোয়ান্টাম যাকাত ফান্ডে?

published : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫

ইসলামের অন্যতম রুকন হলো যাকাত। নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলে একজন মুসলমানকে বাধ্যতামূলকভাবে যাকাত দিতে হবে। তবে ব্যক্তিগতভাবে নয়, যাকাত দিতে হবে সঙ্ঘবদ্ধভাবে- এটাই ইসলামের শিক্ষা, নবীজীর (র) দেখানো নিয়ম। যাকাত সংগ্রহকারী ফান্ড ঠিক করবে কাকে কতটা যাকাত দেয়া হবে।

আরো পড়ুন : যাকাত কেন সঙ্ঘবদ্ধভাবে দিতে হবে? ব্যক্তিগতভাবে দিলে কি যাকাত আদায় হবে না?

তবে আপনার যাকাত কোন ফান্ডে দেবেন তা একজন সচেতন মানুষ হিসেবে যাচাই করার সম্পূর্ণ অধিকার আপনার রয়েছে।

যাকাত প্রদানের নির্ভরযোগ্য জায়গা কোয়ান্টাম যাকাত ফান্ড

যাকাতের একটি উদ্দেশ্য হলো যাকাতগ্রহীতাকে স্বাবলম্বী করা, যা একাকী করা বেশ কঠিন। তবে অসংখ্য যাকাতদাতার যাকাতের অর্থ একত্র করা গেলে অনেক দুস্থকে স্বাবলম্বী করা সম্ভব, যা যাকাতদাতা ও গ্রহীতা উভয়ের জন্যেই কল্যাণের। যাকাতের উভয় পক্ষকেই কল্যাণের এই ধারায় সম্পৃক্ত করতে ১৯৯৬ সালে শুরু হয় কোয়ান্টাম যাকাত কার্যক্রম। কালক্রমে কোয়ান্টামের এ প্রয়াসে যুক্ত হয়েছেন হাজারো যাকাতদাতা। আর তাদের সঙ্ঘবদ্ধ যাকাতে হাজারো পরিবার পেয়েছে স্বাবলম্বনের পথে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি।

নিজের ভরণপোষণে অক্ষম এমন হাজারো মানুষের সম্মানজনক স্বাভাবিক জীবনযাপনকে নিশ্চিত করছে কোয়ান্টাম যাকাত কার্যক্রম। খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান ও যত্নায়নের পাশাপাশি স্বনির্ভর হতে সাহায্য করছে দুস্থ জনগোষ্ঠীকে। রয়েছে যাকাতের অর্থে ঘুরে দাঁড়ানোর অসংখ্য দৃষ্টান্ত।

১. পঙ্গু মানুষটিই এখন সংসারের নির্ভরতা

খুলনার আব্দুর রহমান শিকদার চলাচলে অক্ষম একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী। ১৫/১৬ বছর বয়সে পোলিওতে আক্রান্ত হয়ে তার পা দুটো শুকিয়ে যায়। পরে মাইল্ড স্ট্রোক করে এখন চলাচলে প্রায় অক্ষম। হুইল চেয়ারে চলাচল করেন স্ত্রীর সহায়তায়। রাস্তার পাশে সংকীর্ণ জায়গায় ছোট্ট একটি দোকান চালান তিনি। কিন্তু পুঁজির অভাবে দোকানে মালামাল তুলতে পারছিলেন না। ফলে সংসার চালানোর মতো উপার্জনই হতো না তার। যাপন করছিলেন মানবেতর জীবন।

কোয়ান্টাম যাকাত ফান্ড থেকে তার দোকানে প্রয়োজনীয় মালামাল কিনে দেওয়া হয়েছে। ফলে আয় বেড়েছে, অভাবের সংসারে এসেছে স্বস্তি। নিজের খরচ চালানোর পাশাপাশি এখন প্রয়োজন পড়লে মেয়ের সংসারেও খরচ দেন।

২. “একটাই চাওয়া ছিল, ঋণশোধ করে যেন মরতে পারি!”

আব্দুল ওয়াহাব তালুকদার- বরিশালের এই সত্তরোর্ধ্ব মানুষটি ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে কোনো সহায়তা পান না। সংসার চালান ভ্যানে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি বিক্রি করে। মাঝে গুরুতর অসুস্থ হলে চিকিৎসার জন্যে স্থানীয় মহাজনের কাছ থেকে উচ্চসুদে ঋণ নেন। অভাবের সংসারে স্বল্প আয় থেকে ঋণ পরিশোধ করতে পারছিলেন না। পরিণামে ঋণদাতার হুমকি-ধামকি অপমানে বাধ্য হয়ে এক এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে আগের ঋণ শোধ করেন। সেই ঋণ আবার শোধ করেন আরেক এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে। এভাবেই আটকে পড়েন ঋণের জালে।

ঋণের চাপে যখন তিনি দিশেহারা তখন তার পাশে দাঁড়ায় কোয়ান্টাম। তার এক লাখ টাকা ঋণের পুরোটাই শোধ করে দেয়া হয় যাকাত ফান্ডের অর্থে। ফলে এখন তিনি এখন যাপন করছেন চাপমুক্ত নির্ভার জীবন।

৩. তিনবার সন্তান হারানো সকিনা শেষ পর্যন্ত মা হলেন

চট্টগ্রামের সকিনা আক্তারের প্রথম বিয়ে ভেঙে যায় গর্ভের দুই সন্তান মারা যাওয়ায়। সন্তান লাভের আশায় আবারো বিয়ে করেন। কিন্তু এবারো চার মাস না হতেই গর্ভপাত হয়ে যায় সকিনার।

মা হতে না পারলে এ বিয়েটাও ভেঙে যাবে– এমনি এক আশঙ্কার মাঝে যখন দ্বিতীয়বারের মতো গর্ভবতী হলেন, তখন যোগাযোগ করেন রাজবিলার মাতৃমঙ্গল কেন্দ্রে। গর্ভধারণের ৩ মাস থেকে সন্তান জন্মদানের ৪০ দিন পর্যন্ত মাসে ৩০টি করে ডিম, আয়রন ও ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট, প্রয়োজনীয় ডাল আলু, চিকিৎসা- মাতৃমঙ্গলের সাধারণ এই সেবাগুলোর পাশাপাশি গর্ভের আড়াই মাস থেকে সপ্তাহে ৭৫০ টাকা দামের ইঞ্জেকশন এবং মাসে ১,৫০০ টাকার ওষুধ- এই বাড়তি খরচটুকুও পেয়েছেন তিনি।

কোয়ান্টামের এই আন্তরিক ও নিবিড় সেবায় গত ১৯ জানুয়ারি ফুটফুটে মেয়েশিশুর মা হয়েছেন সকিনা আক্তার। তার সিজারিয়ান অপারেশন, ওষুধ, খাবার আর হাসপাতালে আনা-নেওয়ার যাবতীয় খরচই যে শুধু কোয়ান্টাম বহন করেছে, তা নয়; এটেন্ডেন্ট হিসেবেও সার্বক্ষণিক তার সাথে ছিল একজন কোয়ান্টাম কর্মী।

৪. পরিবার থেকে বিতাড়িত নওমুসলিম আল আমীন এখন স্বাবলম্বী

খুলনার ২৪ বছরের তরুণ আব্দুল্লাহ আল আমীন ধর্মান্তরিত হওয়ায় পরিবার থেকে বিতাড়িত হন। টিউশনির টাকায় স্ত্রীকে নিয়ে কষ্টে দিনাতিপাত করছিলেন। তার অবস্থা জেনে তাকে ভ্যান এবং মালামাল কেনার জন্যে ৩৫ হাজার টাকা অর্থ সাহায্য করা হয় কোয়ান্টাম যাকাত ফান্ড থেকে। এখন কার্টে করে সবজি বিক্রি করেন। আগের চেয়ে অনেকটাই ভালো আছেন তিনি।

৫. এখন নিজের খরচ নিজেই চালাতে পারেন নাসিমা

যশোরের মনিরামপুরে একটা জীর্ণ কুটিরে ৩ ছেলেমেয়ে নিয়ে দিনাতিপাত করে নাসিমা। ছোট ছেলেটা যখন পেটে তখন তার স্বামী আরেকটা বিয়ে করে চলে যায়। সহায়হীন এতিম নাসিমা পড়েন অথৈ জলে। এমনই সঙ্কটে কোয়ান্টাম তার পাশে দাঁড়ায়। গর্ভকালীন মাসে ৩ হাজার টাকা করে ৫ মাস অর্থসাহায্য দেয়া হয়, কিনে দেয়া হয় একটি ছাগল। সন্তান জন্মের পর নাসিমা এখন অন্যের বাসায় কাজ করে নিজের খরচ নিজেই চালান।

৬. ডুবতে থাকা সংসারের হাল ধরেছেন রাশিদা

প্রবাসে কিছু করতে না পেরে কুমিল্লার রাশিদা বেগমের স্বামী যখন দেশে ফিরে এলো তখন চোখে অন্ধকার দেখতে শুরু করেন তারা। বেকার স্বামী আর দুই সন্তানকে নিয়ে ভাঙাচোরা ঘরে কোনোমতে থাকতেন তারা। এমনই সময় রাশিদা খোঁজ পান কোয়ান্টাম কুমিল্লা শাখা পরিচালিত ‘স্বনির্ভরায়ন সেলাই প্রশিক্ষণ’ কার্যক্রমের। সেলাই প্রশিক্ষণ শেষে তাকে কিনে দেয়া হয় সেলাই মেশিন।

বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে সেলাইয়ের অর্ডার নিতেন তিনি। সেলাই, বুটিক, বাটিকের কাজ করে এখন তার আর্থিক অবস্থা অনেক ভালো। নিজের খরচে স্বামীকে দুবাই পাঠিয়েছেন। তিন ছেলেকে নিয়ে এখন দুই বেডরুম, দুই বাথরুম, ড্রইং, ডাইনিং, কিচেনের ভাড়া ফ্ল্যাটে থাকেন তিনি।

৭. লিল্লাহ বোর্ডিং

শিশুদের কোরআনের আলোয় আলোকিত করার উদ্দেশ্যে কোয়ান্টাম প্রতিষ্ঠা করেছে দুটি হিফজখানা- ইমাম গাজ্জালী (রহ) হাফেজিয়া মাদ্রাসা এবং মুহাদ্দিসা আসমা (রা) হাফেজিয়া মাদ্রাসা। মাদ্রাসা দুটিতে কোরআন হিফজ করছে যথাক্রমে ৪০ জন ছেলেশিশু এবং ৩৯ জন মেয়েশিশু। এই দুটি মাদ্রাসায় দুস্থ এতিম শিশুদের খাবারের সংস্থান হয় যাকাত ফান্ডের অর্থে।

এছাড়াও, চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার পুটিবিলায় অবস্থিত গৌড়স্থান শাহ ইমাম গাজ্জালী (র) হেফজখানার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ভোজ্যপণ্য যেমন চাল ডাল তেল ইত্যাদি সরাবরাহ করা হয় কোয়ান্টাম যাকাত ফান্ডের অর্থায়নে।

৮. উপার্জন এবং লেখাপড়া দুইই চলছে সমান তালে

শেফালী রহমান। স্বামীর ক্যান্সার চিকিৎসা করতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া এই নারী নিজেও ক্যান্সার রোগী। একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটির মৃত্যুতে পুরো পরিবার পথে বসে যায়। সংসারের হাল ধরে তাদের কিশোর সন্তান। কিন্তু তাতে আর কতটুকুই বা হয়!

না, যুদ্ধটা তাদের আর একা করতে হয় নি। পাশে দাঁড়িয়েছে কোয়ান্টাম। কোয়ান্টাম যাকাত ফান্ডের সহায়তায় স্বামীর রেখে যাওয়া ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন শেফালী রহমান। তার কিশোর ছেলেটি এখন ব্যবসা দেখার পাশাপাশি পড়াশুনাও করতে পারছে।

৯. পথের মানুষটিকে আর পথে ফিরে যেতে হয় নি

অশীতিপর বৃদ্ধা কুলসুমা বেগমকে পাওয়া যায় বিশ মাস আগে চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লায়। অচেতন, এক পা ভাঙা। চিকিৎসায় সুস্থ হলেও নিজের নাম ছাড়া মনে করতে পারেন না আর কিছুই। এদিকে হাসপাতালেও তো দিনের পর দিন রাখা যায় না। তাহলে কি পথের মানুষটাকে আবার পথেই ফিরে যেতে হবে?

না, তাকে পথে ফিরে যেতে হয় নি। সন্তান থেকেও পরিবারে যার আশ্রয় হয় নি, ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবন চালাতে হয়েছে, আশ্রয়মমে তিনি পেয়েছেন মমতার আশ্রয়। বান্দরবানের রাজবিলায় কোয়ান্টাম যাকাত ফান্ডের অর্থে পরিচালিত এই প্রবীণ নিবাসে আরো ৪২ বৃদ্ধ-বৃদ্ধার মতো তিনিও পাচ্ছেন আশ্রয়, তিন বেলা আহার, চিকিৎসা, বস্ত্রসহ জীবনযাপনের জন্যে প্রয়োজনীয় সবকিছু।

১০. মাথাগোঁজার ঠাঁই পেয়েছেন অসহায় বৃদ্ধা

ঝালকাঠির মোরশেদা বেগমের টিনের ঘরটি গত বন্যায় মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নিজে অন্যের বাসায় কাজ করে খান, সন্তানেরাও দিনমজুর, ঘর তুলবেন কী করে? এদিকে জরাজীর্ণ ঘরটি যে-কোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে। তেমন হলে কোথায় যাবেন তিনি?

মোরশেদা বেগম এখন নিজের ঘরে আরামেই আছেন। টিনশেড পাকা ঘরটি নির্মাণে তাকে যাকাত ফান্ড থেকে দেয়া হয়েছে নগদ ১ লক্ষ টাকা।

এমন হাজারো মর্মন্তুদ গল্প আছে আমাদের

যাত্রা শুরুর তিন দশকে কোয়ান্টাম যাকাত ফান্ড যে বিশাল সেবাকর্ম সম্পাদন করেছে তা শুধুই বিস্ময়ের।

একনজরে কোয়ান্টাম পরিচালিত সেবাকাজ (পরিসংখ্যান ডিসেম্বর, ২০২৪ পর্যন্ত)

  • ২,৫০০+ সুবিধাবঞ্চিত ও এতিম শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে বান্দরবান লামার কোয়ান্টাম কসমো স্কুলে।
  • ঢাকার পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সন্তানদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রাজধানী আদর্শ বিদ্যাপীঠ-এর সার্বিক পরিচালনার দায়িত্বসহ শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সহায়তা দেয়া হচ্ছে।
  • মেধাবী শিক্ষাবৃত্তি পেয়েছে ৩,১১৩ জন মেধাবী অসচ্ছল শিক্ষার্থী
  • ৩,৭০৬ জনের ছানি অপারেশনসহ চক্ষু চিকিৎসাসেবা পেয়েছেন ২০,২১১ জন দুস্থ রোগী
  • চিকিৎসাসেবা পেয়েছেন ১১,১৭৮ জন গৃহকর্মীসহ ৭,০৯,১৯০ জন দরিদ্র রোগী
  • মাতৃমঙ্গল কার্যক্রমে চিকিৎসা ও পুষ্টি সহায়তা পেয়ে সুস্থ সন্তান জন্ম দিয়েছেন ৫৭,১৭৫ জন দুস্থ প্রসূতি
  • শীতবস্ত্র ও অন্যান্য বস্ত্র বিতরণ করা হয়েছে ১,৭৬,৯৮১টি।
  • বন্যায় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ত্রাণ সাহায্য দেয়া হয়েছে ২৩,০৫০টি পরিবারে।
  • দেশের বিভিন্ন স্থানে সম্বলহীন ৩,০০০+ পরিবারকে বাড়ি তৈরি করে দেয়া হয়েছে
  • স্বনির্ভরায়ন প্রকল্পের আওতায় স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করা হয়েছে ৩৬,২২৪ জনকে

এই বিশাল সৎকর্মের অংশীদার হতে পারেন আপনিও!

কেবল একা ভালো থাকা নয়, সবাইকে নিয়ে ভালো থাকার জন্যেই যাকাত ব্যবস্থা। আত্মকেন্দ্রিকতা, স্বার্থপরতা এবং সম্পদ জমিয়ে রাখার ধারণাকে বিলোপ করে দেয় যাকাতের বিধান। সহীভাবে এই বিধান পালনে শুধু ব্যক্তির সম্পদই পরিশুদ্ধ হয় না, নিঃস্ব রিক্ত অসহায় বঞ্চিতরাও পারেন ঘুরে দাঁড়াতে। আর তা সম্ভব যদি যাকাত দেয়া হয় কোয়ান্টামের মতো সঙ্ঘবদ্ধ যাকাত ফান্ডে।

তাই নির্দ্বিধায় নিঃসংশয়ে আপনার যাকাত দিন কোয়ান্টাম যাকাত ফান্ডে। আমরা একসাথে হাসি ফোটাব অজস্র দুস্থ বঞ্চিতের মুখে।