published : ২০ মার্চ ২০২৫
আজ International Day of Happiness তথা আন্তর্জাতিক সুখ দিবস। World Happiness Report 2025 অনুযায়ী বিশ্বের সবচেয়ে সুখী দেশ ফিনল্যান্ড। টানা ৮ম বারের মতো সুখী দেশের তালিকায় শীর্ষে দেশটি।
এই তালিকায় ফিনল্যান্ডের পরে থাকা ৯টি দেশ হলো- ডেনমার্ক, আইসল্যান্ড, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস, কোস্টারিকা, নরওয়ে, ইসরায়েল, লুক্সেমবার্গ এবং মেক্সিকো।
কম আয়বৈষম্য
ফিনদের সুখের একটি বড় কারণ হলো নিম্ন আয় বৈষম্য। একটি দেশ কতটা ধনী তার একটি মাপক হলো গড় মাথাপিছু আয়। আর আয়বৈষম্য পরিমাপের ইকনোমিক ফরমুলা হলো Gini coefficient বা জিনি সহগ।
মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে শীর্ষ ১০ সুখী দেশের মধ্যে ইসরায়েল, কোস্টারিকা ও মেক্সিকো ছাড়া পরবর্তী সবগুলো দেশই ফিনল্যান্ডের চেয়ে এগিয়ে। কিন্তু দেশটির Gini coefficient আইসল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডস ছাড়া সবগুলো দেশের চেয়ে কম। অর্থাৎ, এই দুটি দেশ ছাড়া বাকি দেশগুলোর চেয়ে ফিনল্যান্ডে আয়বৈষম্য কম। তাদের সম্পদ অনেক, কিন্তু তা অল্প কিছু মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না, যেটা দেখা যায় বেশিরভাগ শীর্ষ ধনী দেশের ক্ষেত্রে।
একটি ফিনিশ প্রবাদ হচ্ছে, সুখ হলো খুব কম এবং খুব বেশির মধ্যে অবস্থিত একটি পর্যায়। তাদের আয়বৈষম্যের ব্যাপারটা এই প্রবাদেরই যেন বাস্তব রূপায়ন।
সংস্কৃতিতে সুখী হওয়ার উপাদান
ফিনল্যান্ডের মনোবিদ ও সুখগবেষক ফ্রাঙ্ক মারটেলার মতে, মানুষকে সুখী করার পেছনে রাষ্ট্রের ভূমিকা থাকে, এটা ঠিক। কিন্তু একটা জাতির নিজস্ব সংস্কৃতিতেও থাকতে পারে সুখী হওয়ার উপাদান। যে দেশের মানুষ সুখ খুঁজতে মরিয়া, তাঁদের মধ্যেই সুখ সবচেয়ে কম। এটিই মূলত ফিনিদের সুখী হওয়ার মূলমন্ত্র।
ফিনল্যান্ডের মানুষ বিশ্বাস করে, সুখ অন্যকে দেখানোর বিষয় নয়। বরং তা হৃদয়ে ধারণ করার বিষয়। যখনই কেউ নিজের সম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তির প্রদর্শনীতে নামে তখন সে আসলে নামে সুখ হারানোর ঘোড়দৌঁড়ে। এ কারণেই ফিনল্যান্ডের রাস্তায় দামি গাড়ি খুব একটা দেখা যায় না। এমনকি বড় বড় প্রতিষ্ঠানের সিইওরাও সাদামাটা ভলভো বা ভক্সওয়াগন চালান।
ফিনিশরা বাধাবিপত্তিকে জীবনেরই অংশ বলে ভাবতে পছন্দ করে। তারা বিশ্বাস করে, যে অবস্থাতেই থাকি না কেন, সব সময়ই এর থেকে আরেকটু ভালো থাকার উপায় আছে। কী নেই, সেদিকে নজর না দিয়ে যদি এখনো আমার হাতে কী আছে তা নিয়ে ভাবি, তাহলে সামনে এগোনো সহজ হয়। এটাই হলো শোকরগোজার দৃষ্টিভঙ্গি।
ভালো সিস্টেম
ফিনল্যান্ডের শক্তির একটি জায়গা হলো ভালো সিস্টেম। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় স্বাস্থ্যব্যবস্থার কথা। ফিনল্যান্ডের গণ-অর্থায়নে পরিচালিত হেলথ কেয়ার সিস্টেমের বাইরে একটি খুব ছোট বেসরকারি স্বাস্থ্য খাত রয়েছে। সেটিও অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর। দেশটির পাবলিক ট্রান্সপোর্ট নির্ভরযোগ্য এবং সাশ্রয়ী খরচের।
সুস্থ জীবনাচার
ফিনরা বিশ্বাস করে সুখ কেউ রুপার থালায় সাজিয়ে আপনার সামনে হাজির করবে না। আপনার সুখের দায়িত্ব আপনারই। এই বিশ্বাসের প্রতিফলন তাদের জীবনেই দেখা যায়।
দেশটির জীবনযাত্রার মান খুবই উন্নত। ফিনিশরা নিয়মিত হাঁটে, সাঁতার কাটে, সাইকেল চালায়। অর্থাৎ, শারীরিকভাবে ফিট থাকার চর্চা করে। নিয়মিত ঘুরতে যাওয়া, প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকা তাদের সুখী জীবনযাপনে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
এদেশে ধনী ও দরিদ্রদের মধ্যে সম্পদের ব্যবধান খুবই কম। দেশটির মানুষের কর্মজীবন ভারসাম্যপূর্ণ, পরিবেশ উন্নত এবং উন্নতমানের স্বাস্থ্যসেবা রয়েছে। এদের সমাজব্যবস্থার নিয়ম হলো, সবাই সুযোগ-সুবিধা যেমন ভোগ করবে, তেমনি সব অসুবিধাও নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেবে।
World Economic Forum-এর তথ্যানুযায়ী, লিঙ্গ সমতা বিবেচনায় বিশ্বের সেরা দেশ এটি। মনোমুগ্ধকর ভূপ্রকৃতির অধিকারী এই দেশটির নাগরিকদের খুব বেশি ট্যাক্স দিতে হয় না। তা সত্ত্বেও বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা পায় তারা।
ছোট্ট এই দেশটির মানুষেরা বেশ সামাজিক। ব্যস্ততা থাকলেও একে অপরকে সহযোগিতা করাকেই এরা প্রাধান্য দেয়।
দেশটির একটি ব্যাতিক্রমী দিক হলো Debt-break বা ঋণ বিরতি। অর্থাৎ এরা ঋণ দেয় না এবং কাউকে ঋণ করতে উৎসাহিতও করে না। এমনকি ক্রেডিটে কিনতেও না। আর ঋণমুক্ত জীবন মানেই স্বস্তির জীবন।
১৯৯৫ সালে ইংল্যান্ডের গবেষকদের জরিপে সবচেয়ে সুখী মানুষের দেশ ছিল বাংলাদেশ। আমাদের শীর্ষ সুখী দেশ হওয়ার মূল কারণ ছিল আমাদের পারিবারিক বন্ধন।
তখন আমাদের অভাব ছিল; আমরা বার্গার খেতে পারতাম না। কিন্তু আমাদের পরিবারগুলোর মধ্যে ছিল সুদৃঢ় বন্ধন। পরিবারে একে অপরের প্রতি ছিল হৃদয়ভরা টান।
আস্তে আস্তে আমরা আধুনিক হতে লাগলাম আর আমাদের পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হতে শুরু করল। যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার তৈরি হলো। আমরা হারালাম আমাদের শক্তির জায়গা- পরিবার! দুর্যোগ দুর্বিপাক অসুখ-বিসুখ হতাশা দুশ্চিন্তা সংকটে যা সবসময়ই আমাদের জুগিয়ে এসেছে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি।
একক পরিবারে যে বন্ধনটুকু ছিল সেটাও বিনষ্ট হয়ে গেল প্রযুক্তির উৎকর্ষের সাথে সাথে। গত তিন দশক ধরে টিভি, স্মার্টফোন, অনলাইন জুয়া, অনলাইন গেম, ডিজিটাল আসক্তিতে পরিবারগুলো নিমজ্জিত হয়েছে। টিভি সিরিয়াল, ল্যাপটপ, ট্যাব, স্মার্টফোনে প্রত্যেকের একেকটা নিজস্ব জগত গড়ে উঠেছে। ফলে পাশাপাশি থেকেও মানসিকভাবে পরস্পর হয়ে গেছে যোজন যোজন দূরের মানুষ।পরিণাম- মাথাপিছু আয় ও সম্পদের দিক থেকে আমরা অনেক এগোলেও পিছিয়ে পড়েছি সুখের দিক থেকে।
আসলে কেউ এমনি এমনি সুখী হতে পারে না, সুখী হওয়া একটি প্রসেস বা প্রক্রিয়া। সুখের প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করলেই আপনি পারবেন সুখী হতে। এজন্যে কিছু করণীয়ঃ
সূরা রাদের ১১নং আয়াতে আল্লাহ বলছেন, নিজের ভেতর থেকে না বদলালে (অর্থাৎ দৃষ্টিভঙ্গি না বদলালে) আল্লাহ কোনো জাতির (বা মানুষের) অবস্থা বদলান না।
অতএব, জাতিগত অবস্থা বদলে প্রয়োজন আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন; নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বদলে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ। সবসময় শোকরগোজার থাকা। নবীজী (স) বলেছেন, নেয়ামত হচ্ছে বন্য ঘোড়া। আর শুকরিয়া হচ্ছে এর লাগাম।
শোকরগোজার হওয়ার একটি সুন্দর চর্চা কোয়ান্টাম সদস্যরা রোজ সকালে করেন- ঘুম ভাঙতেই বলেন, প্রভু তোমাকে ধন্যবাদ আরেকটি নতুন দিনের জন্যে।
প্রো-একটিভ হওয়া মানে অন্যের আচরণ দ্বারা প্রভাবিত না হওয়া। রাগ ক্ষোভ অভিমান বিরক্তি থেকে মনকে মুক্ত রাখা। এই গুণগুলো যার মধ্যে আছে সেই পারে পায়ে পায়ে সাফল্যপানে এগিয়ে যেতে। মনে রাখবেন প্রো-একটিভ = জয়, আর রি-একটিভ = পরাজয়।
নিজের যত্ন নিন। আপনি যে পেশার মানুষই হোন না কেন, নিজের কাজটুকু করুন সবচেয়ে ভালোভাবে। এটা এমন একটা গুণ যা সাফল্যকে আকৃষ্ট করে।
প্রাইভেসির অজুহাতে পরিবারের সদস্যদের সাথে দূরত্ব তৈরি করবেন না। ভার্চুয়াল ভাইরাসমুক্ত হোন, পরিবারের সদস্যদের সাথে কাটান কোয়ালিটি সময়। কারণ পরিবারই আপনার শক্তির জায়গা।
ধনবৈষম্য দূরের একটি চমৎকার ইসলামিক অনুশাসন হলো যাকাত। আমরা যদি আমাদের যাকাত যথাযথভাবে আদায় করি তাহলেই ধনবৈষম্য কমে আসবে। দরিদ্র বলতে কিছু থাকবে না।
এছাড়াও, প্রতিদিন আর্তের জন্যে কিছু না কিছু দান করুন। দান করলে শুধু গ্রহীতারই উপকার হবে না, আপনারও কল্যাণ হবে। কারণ দান প্রাচুর্য বয়ে আনে।
আপনি প্রো-একটিভ ও শোকরগোজার যাতে হতে পারেন এবং নিজের সম্ভাবনার যথাযথ বিকাশ ঘটিয়ে সফল হতে পারেন সেজন্যে নিয়মিত মেডিটেশন করুন। মেডিটেশন বাড়ায় অন্তর্গত শক্তি, উন্মোচন করে নতুন সম্ভাবনার দ্বার।
একজন ধ্যানী ব্যর্থ হতে পারে, কিন্তু হতাশ হয় না। ব্যর্থতার ভেতর থেকেও সে খুঁজে বের করতে পারে সাফল্যসূত্র। তাই মেডিটেশনকে পরিণত করুন আপনার রোজকার জীবনের অংশে।