
published : ৯ মে ২০২৬
একজন কোয়ান্টিয়ার, মানে কোয়ান্টাম স্বেচ্ছাসেবী সদস্য তার এবং তার পরিচিত কয়েকজনের জন্যে কোরবানির গোশতের বক্স নিয়ে বাসায় ফিরছিলেন। পথে একটা সরু গলি। সেটাতে ঢুকে কিছুদূর যেতেই একটি ঘর থেকে শুনতে পেলেন ছোট এক শিশুর কণ্ঠ। করুণস্বরে সে তার মাকে বলছে, “মা! এবার কোরবানিতে তো কেউ আমাদের গোশত দিলো না! আমরা গোশত খাব না?”
কথাটি শুনে সেই তরুণের চোখে পানি চলে এলো। তাড়াতাড়ি বাসায় চলে গেলেন তিনি। গোশতের অন্য বক্সগুলো রেখে তার নিজের ভাগের বক্সটা নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। চলে গেলেন সেই বাসায়, সেই মায়ের হাতে গোশতের বক্সটা দিয়ে বললেন, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন আপনাদের জন্যে এই ‘ঈদ উপহার’ পাঠিয়েছে!
মহিলা তো বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ! কিছুটা ধাতস্থ হয়ে ছলছল চোখে বললেন, স্বামীর মৃত্যুর পর এই কয়েক বছরে কোরবানির দিন কেউ তাদের খোঁজ নেয় নি! ফলে ঈদে কোরবানির গোশতের স্বাদ পাওয়া হয় না তাদের। কোরবানির সামাজিকায়নের এমন চমৎকার উদ্যোগ যে কোনো প্রতিষ্ঠান নিতে পারে তা ছিল তার অজানা এবং বিস্ময়ের ব্যাপার।
গতবছর সারাদেশে ঈদুল আজহায় পশু কোরবানি হয়েছে প্রায় ৯১ লক্ষ। যার মধ্যে গরু-মহিষ ৪৭ লাখ। বাকিটা ছাগল ভেড়া উট দুম্বা।
একেকটি গরু-মহিষ থেকে গড়ে তিন মণ বা ১২০ কেজি ধরলে ৪৭ লাখ গরু থেকে পাওয়া যাবে প্রায় ৫৬ কোটি কেজি গোশত। বাকি পশুগুলো থেকে যদি ৫ কোটি কেজি গোশতও পাওয়া যাবে তাহলে মোট গোশতের পরিমাণ হওয়ার কথা ৬১ কোটি কেজি। ১৭ কোটি মানুষের মাথাপিছু সাড়ে ৩ কেজি আর ৪ সদস্যের একটি পরিবারের ১৪ কেজি গোশত পাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না বণ্টনব্যবস্থা যথাযথ না হওয়ায়। ফলে অনেকের ভাগে জোটে না কোরবানির এক টুকরো গোশতও।
বিশেষত শহরাঞ্চলে পশু কোরবানির পর একই বিল্ডিংয়ে থাকা পরিবারগুলোর বাইরে পার্শ্ববর্তী ভবনে থাকা প্রতিবেশীদের মধ্যে গোশত বিতরণের চল কম। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এমনটা হয়- বেঁচে যাওয়া বিতরণের গোশত দারোয়ানের কাছে রেখে আসা হলো, তার প্রতি নির্দেশনা- কেউ গোশত চাইতে এলে তাকে গোশত দিয়ে দেয়া। এতে কিছু মানুষ অনেক গোশত পায়, কিছু মানুষ পায় না মোটেই। বিশেষ করে যারা দারিদ্র বা অন্য কোনো কারণে কোরবানি দিতে পারেন না এবং কোরবানির গোশত চাইতেও পারেন না, তারা।
কেউ কেউ গোশত ৩ ভাগ করে ১ ভাগ বিতরণ করেন, আর ২ ভাগ নিজেরা রেখে দেন। কেউ আবার দুটো গরু/ছাগল কোরবানি করে একটা বিতরণ করেন, একটা রাখেন নিজেদের জন্যে।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে-
কোরবানির পশুকে আল্লাহ তাঁর মহিমার প্রতীক করেছেন। তোমাদের জন্যে এতে রয়েছে বিপুল কল্যাণ। অতএব এগুলোকে সারিবদ্ধভাবে বাঁধা অবস্থায় এদের জবাই করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করো। এরপর এরা যখন জমিনে লুটিয়ে পড়ে, তখন তা থেকে (মাংস সংগ্রহ করে) তোমরা খাও এবং কেউ চাক না চাক সবাইকে খাওয়াও - সূরা হজ, আয়াত ৩৬
অর্থাৎ, সবাইকে কোরবানির গোশত খাওয়ার সুযোগ করে দেয়া সরাসরি আল্লাহরই নির্দেশ।
হিজরি নবম বর্ষে আশপাশের জনপদ থেকে ক্ষুধার্ত বেদুইনরা মদীনায় এসে সমবেত হয়। সেবছর ঈদুল আজহায় নবীজী (স) কোরবানির গোশত তিনদিনের বেশি জমিয়ে রাখতে সাহাবীদের নিষেধ করেন। যাতে কোরবানিদাতাদের কাছে অতিরিক্ত গোশত জমে না থাকে, অভাবী মানুষগুলোও গোশতের স্বাদ পায়।
বিদায় হজের বছর নবীজী (স) ১০০ উট কোরবানি করেন- ৬৩টি করেন নিজের হাতে, বাকি ৩৭টা করেন হযরত আলী (রা)।
এরপর নবীজী (স) নির্দেশ দেন প্রতিটি উট থেকে এক টুকরো করে গোশত নিয়ে এসে একটা হাড়িতে ঢেলে তা রান্না করতে। সেই রান্না করা গোশত নবীজী (স) এবং আলী (রা) একটু খেলেন। বাকিটা সবার মধ্যে বিতরণ করা হলো।
নবীজীর (স) ওফাতের পরও সাহাবী, তাবেঈন, তাবে-তাবেঈনরা এই আদর্শই অনুসরণ করেছেন।
কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন কোরবানির সামাজিকায়নের মাধ্যমে আল্লাহ ও তাঁর রসুলের (স) নির্দেশনাই পরিপালন করতে চায় কোরবানিদাতাদের তাতে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে। কোরবানির পশুর মধ্যে আল্লাহ ‘বিপুল কল্যাণ’ রেখেছেন; এই ‘কল্যাণ’ হতে পারে কোরবানিদাতা ও কোরবানির গোশতগ্রহীতা উভয়েরই।
নবীজী (স) ও সাহাবীরা কোরবানি করে নিজ হাতে আত্মীয় ও প্রতিবেশীদের কাছে গোশত পৌঁছে দিতেন। গরিবদের ডেকে সম্মানের সাথে খাওয়াতেন। এভাবে সৃষ্টি হতো সামাজিক সমমর্মিতা। যেটার অভাব এখনকার সমাজব্যবস্থায় প্রকট।
এখন গরিবদের সম্মানের সাথে গোশত খাওয়ানো হয় না। বিতরণ করা হয়, তবে অনেক ক্ষেত্রেই সম্মানের সাথে না, বঞ্চনা ও অবহেলার সাথে। দেখা যায় পলিথিন বা কলাপাতায় মুড়ে গোশতের খারাপ অংশগুলো বিতরণ করা হচ্ছে গরিবদের মধ্যে। মুখে না বললেও বঞ্চনাটা তারা ঠিকই অনুভব করেন। ফলে যে বিভেদ মোচনের মাধ্যম হতে পারত কোরবানি, সেটাই আরো সুস্পষ্ট হয়ে উঠছে গোশত বিতরণ থেকে।
বিভেদ মোচন করে সামাজিক সমমর্মিতা বাড়ানোর উদ্যোগ কোরবানির সামাজিকায়ন। এই কার্যক্রমে শুধু সাদরে রান্না করা গোশত খাওয়ানোই হয় না, গোশত বিতরণেও থাকে সম্মান ও যত্নের ছাপ। সুন্দরভাবে বক্সে গোশত ভরে কাপড়ের ব্যাগে করে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়া হয় মমতার সাথে। ধনী-গরিব ভেদে ভিন্নতা করা হয় না গোশতের পরিমাণ ও প্যাকেজিংয়ে। এতে গরিবরা সম্মানিত বোধ করেন নিজেদের, কোরবানি হয়ে ওঠে ধনী ও গরিব দুই শ্রেণীর মানুষের জন্যেই আনন্দের উপলক্ষ।
কোয়ান্টাম দেশব্যাপী কোরবানির সামাজিকায়ন শুরু করে ২০২৪ সাল থেকে। সেবছর কোয়ান্টাম সদস্য ও শুভানুধ্যায়ীদের সম্মিলিত অর্থে পশু কিনে কোরবানি করা হয়। মোট ১১৭টি গরু এবং ৯৯টি ছাগল কোরবানি করে ৯,৭১৫টি পরিবারে গোশত বিতরণ করা হয়, রান্না করে আপ্যায়ন করা হয় ৬ সহস্রাধিক জনকে।
২০২৫ সালে কার্যক্রমের পরিধি আরো বাড়ে। কোরবানি করা হয় ১৬৩টি গরু এবং ১৪১টি ছাগল। মোট ৩২,০৪৮ কেজি গোশত বিতরণ করা হয় ১৯,৫১৫টি পরিবারের মধ্যে। আর রান্না করে গোশত আপ্যায়ন করা হয় ৮ সহস্রাধিক জনকে।
এবছর আমাদের লক্ষ্য অন্তত ৩০ হাজার পরিবারের মধ্যে গোশত বিতরণ। প্রতি ভাগ ২১,০০০ টাকা হিসেবে এক বা একাধিক ভাগের অর্থ দিয়ে অংশ নিন এ বিশাল সৎকর্মে। কোরবানির টাকা জমা দিতে পারেন-
কোরবানিতে নাম দেয়ার পাশাপাশি আপনি নির্দিষ্ট কারো কাছে গোশত পৌঁছাতে চাইলে তার নাম-ঠিকানাও জমা দিতে পারেন। আমরা আপনার পক্ষ থেকে কোরবানির গোশত পৌঁছে দেবো তার কাছে।
আসুন, নিজেরা অংশ নেই এই বিশাল পূণ্যের কাজে, পরিচিতদেরও উদ্বুদ্ধ করি অংশ নিতে। আমাদের সকলের আন্তরিক অংশগ্রহণে সার্থক হোক কোরবানির সামাজিকায়ন। আমরা লাভ করি কোরবানির ‘বিপুল কল্যাণ’।