সুস্থতার গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ‘সামাজিক ফিটনেস’ : কীভাবে এর যত্ন নেবেন?

published : ৭ এপ্রিল ২০২৬

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বাস্থ্যকে বলছে- a state of complete physical, mental, and social well-being, not merely the absence of disease. অর্থাৎ, সামাজিক কল্যাণও সুস্থতার অঙ্গ। তাই আজ বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসে আমরা বলব সুস্থতার এই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গটিকে সুস্থ রাখার উপায় নিয়েঃ  

তিন-চার দশক আগেও দুজন বাঙালির দেখা হলে কথার পর কথা চলতেই থাকত। বাস-লঞ্চ-ট্রেনে—সহযাত্রীদের গল্পে কখন যে গন্তব্য এসে যেত! ততক্ষণে হয়ত বেরিয়ে এসেছে তাদের মধ্যে বহুদূরের লতায়-পাতায় আত্মীয়তার সম্পর্ক!

একবিংশ শতাব্দী এলো তথ্য ও যোগাযোগ মাধ্যমের সুনামি নিয়ে     

২০০৭ সালের এক গবেষণায় দেখা গেল একজন মানুষ রোজ টিভি, রেডিও ও ইন্টারনেট থেকে যত তথ্য গ্রহণ করে, তা ছাপলে লাগবে ১৭৪টি পত্রিকা!

২০০৯ সালের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিস্তার এই প্রবাহকে করে আরও তীব্র।

এখন একজন স্মার্টফোন ব্যবহারকারী গড়ে প্রতিদিন প্রায় সোয়া তিন ঘণ্টা স্ক্রিনে কাটায় এবং ২৪ ঘণ্টায় ২,৬১৭ বার ফোন স্পর্শ করে। বাস স্টপ, ট্রেন স্টেশন, বিমানবন্দর—সবখানেই একই দৃশ্য: মাথা নিচু, চোখ দুটো স্ক্রিনে বন্দি। সামাজিক অনুষ্ঠান, বিয়ের আসর—সব জায়গাতেই মানুষ ব্যস্ত সেলফি, লাইভ আর পোস্টে। 

ভার্চুয়াল যোগাযোগ বেড়েছে অনেক, কিন্তু কমে গেছে বাস্তব কথোপকথন। ফলে তৈরি হয়েছে নতুন সমস্যা— সামাজিক বিচ্ছিন্নতা।

সামাজিক বিচ্ছিন্নতার বৈজ্ঞানিক কারণ ও পরিণতি  

আমাদের মস্তিষ্ক যা দেখে শোনে- সব তথ্য জমা রাখে এবং অবচেতনভাবে সেগুলোর মধ্যে সংযোগ তৈরি করে।
কিন্তু এই সংযোগের জন্যে প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন সময়। 

মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স জমানো তথ্য থেকে যা অপ্রয়োজনীয় তা বাদ দেয়। কিন্তু যখন আপনি অনবরত সোশ্যাল মিডিয়ায় ইউটিউবে বুঁদ থাকেন, নিউজ ফিড দেখতেই থাকেন তখন এই হাজারো নোটিফিকেশন একসাথে জমা হতে থাকে। ফলে ভেঙে পড়ে মস্তিষ্কের পাহারাদার ‘প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স’।

ফলাফল- অস্থিরতা বিরক্তি রাগ, মনোযোগের অভাব এবং ফলশ্রুতিতে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা।     

গবেষণা বলছে, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বাড়ায় স্ট্রোকের ঝুঁকি ৩২%, ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি ৫০% এবং অকালমৃত্যুর ঝুঁকি ২৯% বৃদ্ধি পায়।   

New Scientist ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে বলা হয়, সামাজিক সংযোগের অভাব দিনে ১৫টি সিগারেট খাওয়ার মতোই ক্ষতিকর!

বাস্তব সামাজিক যোগাযোগই প্রাকৃতিক ওষুধ 

যখন মানুষে মানুষে সংযোগ হয়—হাত মেলানো, হাসাহাসি, কথা আদানপ্রদান—তখন শরীরে Oxytocin (ভালোবাসার হরমোন) বাড়ে, Dopamine (আনন্দের হরমোন) নিঃসৃত হয়, Cortisol (স্ট্রেস হরমোন) কমে। 

ফলে মন ভালো থাকে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে, মস্তিষ্ক ভালো কাজ করে।  

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৫ বছরের দীর্ঘ গবেষণায় দেখা গেছে- মানুষের দীর্ঘায়ু ও সুস্থতা সবচেয়ে বেশি নির্ভর করে তার সম্পর্কের গভীরতার ওপর।

আর World Health Organization সামাজিক যোগাযোগকে বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছে।

আপনি কীভাবে সোশ্যালি ফিট হবেন? 

১. পরিচিত-অপরিচিতকে সালাম দিন 

যাদের সাথেই দেখা হবে সবাইকে সালাম দিন, কুশল বিনিময় করুন। 

সামাজিক অনিশ্চয়তাবোধের হাই পোটেন্সি প্রতিষেধক হচ্ছে সালাম। যাকে বলতে পারেন ভিটামিন এস। যত সালাম দেবেন আপনি তত অনুভব করবেন ভিটামিন এস-এর প্লাবন, হবে সুখী।

২. বাস্তব সামাজিক যোগাযোগ বাড়ান

ফেসবুক ও অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়াকে আসলে ‘সামাজিক’ বলতে নারাজ বিশিষ্টজনেরা। কারণ শো-অফ, বার্থডে ম্যারেজ ডে-তে লোকদেখানো উইশ আর ক্যাজুয়াল হাই-হ্যালোর বাইরে প্রকৃতই একাত্মতা এসবের মাধ্যমে হয় না। তাই ফেসবুক ইত্যাদির চেয়ে বেশি মনোযোগ দিন বাস্তব সামাজিক যোগাযোগের দিকে। কারণ ফেসবুকে লাইক কমেন্টের সাময়িক আনন্দ হাতের উষ্ণ স্পর্শের বিকল্প কখনোই হতে পারে না।  

৩. ডিজিটাল ফাস্টিং ও ডিজিটাল ডায়েটিং

রাত ১১টায় সকল ডিজিটাল ডিভাইস বন্ধ করে দিন। চেষ্টা করুন সকাল পর্যন্ত ফোন বন্ধ রাখতে। এতে মস্তিষ্ক বিশ্রাম নেয়ার সুযোগ পাবে। 

এর বাইরেও ডিভাইস ব্যবহার সীমিত করুন। চেষ্টা করুন কমপক্ষে ৪ ঘণ্টা ফোন-মুক্ত সময় রাখুন।

৪. পারিবারিক একাত্মতা বাড়াতে মনোযোগী হোন

পরিবারের শুধু পাশাপাশি থাকা না, হৃদয়টাকেও পাশাপাশি রাখা প্রয়োজন।

একবার এক মার্কিন সাংবাদিক স্বামী বিবেকানন্দের ইন্টারভিউ নিচ্ছিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন

“আপনি বলছিলেন, কন্টাক্ট এবং কানেকশনের কথা- এই দুটো কি আলাদা?”

স্বামী বিবেকানন্দ স্মিত হেসে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি নিউইয়র্কে থাকেন? বাড়িতে কে কে আছেন?”

সাংবাদিক ভাবলেন, তিনি প্রশ্নটা এড়িয়ে যাচ্ছেন বলে ব্যক্তিগত প্রশ্ন করছেন। কিছুটা বিরক্ত হলেও তা প্রকাশ না করে বললেন, 

“মা মারা গেছেন। বাবা আছেন। আর তিন ভাই ও এক বোন। সবাই বিবাহিত”

“বাবার সাথে শেষ কবে কথা হয়েছে?” 

“মাসখানেক হবে”

“ভাইবোনের সাথে দেখা হয়? শেষ কবে ফ্যামিলি গেট টুগেদার হয়েছে?”

(অনেকটা অপ্রস্তুত হয়ে) “দু’বছর আগে ক্রিসমাসের সময়। আমরা দুদিন একসাথে কাটিয়েছি”

“বাবার পাশে কতক্ষণ বসেছিলেন? একসাথে খাবার খেয়েছিলেন? মা মারা যাবার পর তিনি কীভাবে সময় কাটাচ্ছেন জিজ্ঞেস করেছিলেন?”

এবার সাংবাদিকের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে গেল। স্বামী বিবেকানন্দ তার হাত ধরে বললেন, 

“আমি দুঃখিত আপনাকে অজান্তে আঘাত দিয়ে থাকলে। আসলে এটাই আপনার প্রশ্নের উত্তর! বাবার সাথে আপনার কন্টাক্ট, মানে যোগাযোগ আছে, কিন্তু কানেকশন নাই!” 

আসলে কানেকশন একাত্মতা সংযুক্তি- এটা হৃদয়ে হৃদয়ে হয়। একসাথে বসায়, খাবার ভাগাভাগি করে খাওয়ায়, একে অপরের খেয়াল রাখায়, স্পর্শ করায়, একসাথে সময় কাটানোতে হয়।

৫. নিয়মিত সাদাকায়নে অংশ নিন 

বর্তমান সময়ে বাস্তব সামাজিক যোগাযোগের একটি বড় মাধ্যম হচ্ছে সাদাকায়ন।

সাদাকায়নে যখন আপনি যাবেন, পারস্পরিক কুশল বিনিময় করবেন, হাত মেলাবেন এবং প্রাণখোলা হাসিতে ডুবে যাবেন, তখনই ডোপামিনের নিঃসরণ ঘটবে। ফলে স্ট্রেস থেকে আপনি মুক্ত হবেন।

আসলে সুস্থতার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রেসক্রিপশন কোনো ফার্মেসিতে নেই—এটা লুকিয়ে আছে মানুষের মাঝেই। তাই বাস্তব জীবনের মানুষকেই প্রাধান্য দিন, আপনার সোশ্যাল ফিটনেস বাড়বে। আপনি যত্ন নিতে পারবেন বাকি ফিটনেসেরও।