
published : ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
একজন মানুষ, যাকে যতই সমালোচনা করা হোক, মুখ খোলেন না। পাল্টা জবাবও দেন না, নিজে কারো নামে বদনামও করেন না। জ্ঞানচর্চায় ছেদ পড়বে বলে রাজদরবারে অর্থমন্ত্রী ও প্রধান বিচারকের মতো লোভনীয় পদ অবলীলায় ফিরিয়ে দেন, এমনকি ফিরিয়ে দেয়ার ‘অপরাধে’ সুলতানের দেয়া শাস্তি সত্ত্বেও।
তিনি আমাদের সবার চেনা ইমাম আবু হানিফা।
ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাদের নাম উচ্চারণ করলেই মনে ভেসে ওঠে জ্ঞান, ধৈর্য আর নিষ্ঠার এক অসাধারণ চিত্র। ইমাম আবু হানিফা (রহ) তাদের মধ্যে অন্যতম।
আজ পৃথিবীর মুসলিম উম্মাহর প্রায় অর্ধেকই ‘হানাফি মাযহাব’ নামে যে ফিকহি পদ্ধতি অনুসরণ করেন, তার প্রতিষ্ঠাতা তিনিই। বাংলাদেশসহ বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ ধর্মচর্চা করে অনুসরণ করে এই মাজহাব। কিন্তু তার জীবনটা শুধু একটা মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা হওয়ার গল্প নয়; এটা একজন মানুষের গল্প, যিনি সততা, জ্ঞানচর্চা আর আল্লাহ সচেতনতার জন্যে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় সুযোগগুলো পর্যন্ত ছেড়ে দিয়েছিলেন।
তার প্রকৃত নাম- নুমান ইবনে সাবিত। ‘আবু হানিফা’ নামটা আসলে তার উপনাম বা কুনিয়াত, যা দিয়েই তিনি ইতিহাসে পরিচিত হয়ে গেছেন।
ইতিহাসের এই উজ্জ্বল নক্ষত্রের জন্ম ৮০ হিজরিতে, ইরাকের কুফা শহরে।
পরিবার ছিল কাপড়ের ব্যবসায়ী। বাবা সাবিত রেশমের ব্যবসা করতেন, আর সেই সূত্রেই ছোটবেলা থেকে আবু হানিফাও ব্যবসার সাথে যুক্ত ছিলেন। ব্যবসার পাশাপাশি ছোটবেলা থেকেই আবু হানিফার মধ্যে জ্ঞানের প্রতি এক গভীর আগ্রহ ছিল।
একদিন তার জীবনের মোড় ঘুরে যায়, যখন কুফার এক পরিচিত আলেম শা'বী তাকে বলেন, শুধু ব্যবসা নয়, জ্ঞানীদের সাথেও সময় কাটাও। কথাটা তার মনে এমনভাবে গেঁথে যায় যে, তিনি হাম্মাদ ইবনে আবি সুলাইমানের কাছে গিয়ে প্রায় ১৮ বছর শিক্ষা নেন। ব্যবসাও ছাড়েন নি, দুটোই চালিয়ে গেছেন পাশাপাশি।
শুধু তাই নয়, তিনি তার সময়ের অসংখ্য প্রখ্যাত তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়ির কাছ থেকে হাদীস শিখেছেন। তিনি কিছু সংখ্যক সাহাবীর জীবদ্দশায়ও পৌঁছাতে পেরেছিলেন; যদিও হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে তিনি তাবে-তাবেয়িনদের অন্তর্ভুক্ত।
তার শিক্ষাগুরুর মৃত্যুর পর ছাত্ররা তাকেই তাদের নতুন শিক্ষক হিসেবে বেছে নেন। এখান থেকেই শুরু হয় তার নিজস্ব ফিকহি চিন্তাধারা প্রতিষ্ঠার এক নতুন অধ্যায়।
আবু হানিফার পড়ানোর ধরনটা একটু আলাদা ছিল। শুধু হাদীস মুখস্থ করানো নয়, প্রতিটা বিষয়কে যুক্তি দিয়ে বিশ্লেষণ করে বোঝানো- এটাই ছিল তার পদ্ধতি। একে বলে কিয়াস। তার মজলিসে ৪০-এর বেশি বিশেষজ্ঞ ছাত্র একসাথে বসে একেকটা মাসআলা নিয়ে বাহাস করতেন।
ছাত্র আবু ইউসুফ আর মুহাম্মদ ইবনে হাসান শাইবানি, তারাই পরে আবু হানিফার মতামতগুলো লিখে রেখে যান। আর সেখান থেকেই গড়ে ওঠে আজকের হানাফি মাজহাব। ইসলামি ফিকহের ৪টি বড় ধারার একটা, যা আজ পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি মানুষ অনুসরণ করে। এই কারণেই তাকে সম্মান করে ডাকা হয় ‘ইমাম-ই আজম’।
ইমাম আবু হানিফা অনুধাবন করেছিলেন যে, বিশ্বাসীদের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন সমস্যার উদ্ভব হচ্ছে, যার সমাধান সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো প্রয়োজন।
ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মদসহ তার সেরা ছাত্রদের নিয়ে একটি বোর্ড গঠন করেন তিনি। সেখানে কোনো মাসআলা নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক ও আলোচনার পর যখন সবাই একমত হতেন, তখন সেটি লিপিবদ্ধ করা হতো।
এভাবেই বর্তমান সময়ের পরিচিত অধ্যায় অনুযায়ী (পবিত্রতা, নামাজ, রোজা ইত্যাদি) ফিকহ শাস্ত্র সংকলিত হয়।
ইমাম আবু হানিফার সবচেয়ে বড় অবদান হলো, তিনি ইসলামী আইনশাস্ত্রকে একটি সুসংগঠিত, যুক্তিনির্ভর পদ্ধতিতে রূপ দিয়েছেন। তার ফিকহি পদ্ধতির মূল স্তম্ভগুলো ছিল- কোরআন (সর্বোচ্চ ও প্রধান উৎস), হাদীস (বিশুদ্ধ ও প্রমাণিত সুন্নাহ), ইজমা (সাহাবীদের ঐকমত্য), কিয়াস (তথ্য ও যুক্তি বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেয়ার দক্ষতা), ইসতিহসান (প্রয়োজন ও জনকল্যাণের ভিত্তিতে অধিক উপযুক্ত ও কল্যাণকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ), উরফ (সমাজে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা গ্রহণযোগ্য প্রথা)।
এই পদ্ধতি সেই যুগে ছিল অত্যন্ত অভিনব, যা পরবর্তী ফিকহি চিন্তাধারার জন্যে এক নতুন দিগন্ত খুলে দেয়।
বাংলাদেশ, ভারতীয় উপমহাদেশ, তুরস্ক, মধ্য এশিয়া এই অঞ্চলগুলোতে হানাফি মাজহাবের অনুসারীই সবচেয়ে বেশি। এর পেছনে ইতিহাস আছে। দিল্লি সালতানাত আর পরে মুঘল সাম্রাজ্য হানাফি মাজহাবকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছিল। ফলে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটা এই মাটিতে গেঁথে গেছে।
নামাজের নিয়মকানুন থেকে শুরু করে পারিবারিক আইন পর্যন্ত অনেক কিছুই হানাফি ফিকহের ছাঁচে গড়া। এই বিশাল ভৌগোলিক বিস্তৃতিই প্রমাণ করে তার চিন্তাধারার গভীরতা আর প্রাসঙ্গিকতা।
ইতিহাসের পাতায় ইমাম আবু হানিফাকে বর্ণনা করা হয়েছে, এক অত্যন্ত উদার, দানশীল আর বিনয়ী মানুষ হিসেবে। তার ব্যবসা থেকে অর্জিত সম্পদের একটা বড় অংশ তিনি তার ছাত্রদের পড়াশোনার খরচ এবং দরিদ্রদের সাহায্যে ব্যয় করতেন।
বলা হয়, তিনি রাতে দীর্ঘসময় নামাজ ও ইবাদতে কাটাতেন এবং দিনের বেলা ব্যবসা ও জ্ঞানচর্চায় নিয়োজিত থাকতেন।
তার এই ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন- ব্যবসা, জ্ঞানচর্চা, ইবাদত আর সামাজিক দায়িত্ব একসাথে সামলানো আজকের ব্যস্ত জীবনযাত্রায়ও আমাদের জন্যে এক বড় শিক্ষা!
আর ইমাম আবু হানিফার জীবনের এক অসাধারণ দিক হলো তার নীতিগত দৃঢ়তা।
একদিন সুফিয়ান সাওরীকে (তখনকার নামকরা মুহাদ্দিস) জিজ্ঞেস করা হলো, ইমাম আবু হানিফা সম্পর্কে কী মনে করেন? সুফিয়ান সাওরী হেসে বললেন, লোকটা খুব কৃপণ।
প্রশ্নকর্তা তো অবাক! তিনি বললেন, আমরা তো শুনেছি তিনি প্রচণ্ড দানশীল! সুফিয়ান সাওরী থামলেন না, বললেন, দুনিয়ার চোখে দানশীল হতে পারে, কিন্তু আখেরাতের হিসাবে সে খুবই হিসেবী মানুষ। কারণ নিজের নেক আমল সে কাউকে দিতে চায় না, উল্টো অন্যের নেক আমল নিজেই নিয়ে নেয়।
প্রশ্নকর্তা তখনও বুঝলেন না! এটা কীভাবে সম্ভব? সুফিয়ান সাওরী ব্যাখ্যা করলেন যে, আবু হানিফাকে যত সমালোচনাই করা হোক, তিনি জবাব দেন না। নিজেও কারো নিন্দা করেন না, শোনেনও না। ফলে যে তার গীবত করে, তার নেক আমল এমনিতেই এসে জমা হয় আবু হানিফার আমলে।
একদিন কেউ একজন ইমাম আবু হানিফাকে জিজ্ঞেস করে বসল, ইতিহাসের দুই বিখ্যাত মানুষের মধ্যে কে বেশি ভালো ছিলেন। দুজনই ছিলেন সেই সময়ের আলোচিত ব্যক্তিত্ব।
তো ইমাম সাহেব হাসলেন, বললেন, “শোনো, শেষ বিচারের দিনে এই দুজনের মধ্যে কে ভালো, এই প্রশ্ন আল্লাহ আমাকে করবেন না। আমাকে প্রশ্ন করা হবে আমার নিজের কাজ নিয়ে, তোমাকেও তোমার কাজ নিয়ে। অন্যের বিচার করার ভার আমাদের কাউকে দেয়া হয় নি”।
তাই এই তর্কে সময় নষ্ট না করে নিজের ভুল-ত্রুটি খুঁজে বের করা, আর নিজের ভালো দিকগুলো কাজে লাগানোই আসল বুদ্ধিমানের কাজ।
ইমাম আবু হানিফার জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাটা আসে ক্ষমতাসীনদের কাছ থেকেই। উমাইয়া আমলে তাকে কুফার কাজী পদে বসতে বলা হয়েছিল। পরে আব্বাসীয় খলিফা মনসুর তাকে বাগদাদের প্রধান বিচারপতির পদ দিতে চান- সে সময়ের অন্যতম সম্মানজনক ও ক্ষমতাশালী একটা পদ। দুবারই তিনি না করে দেন।
কারণটা সহজ। তিনি মনে করতেন, রাষ্ট্রীয় পদে বসে সত্যিকারের ন্যায়বিচার করা কঠিন, কারণ ক্ষমতার চাপ ঠিকই মানুষের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।
এই প্রত্যাখ্যানের দাম তাকে চড়াই দিতে হয়েছে। কারাবন্দি করা হয় তাকে, নির্যাতনও চলে। অনেক বর্ণনায় পাওয়া যায়, কারাগারে একদিন তাকে যে পানপাত্র দেয়া হয়, তিনি টের পান তাতে বিষ মেশানো। স্পষ্ট বলে দেন, জেনেশুনে বিষ খাবেন না। কিন্তু জোর করেই তার গলায় সেটা ঢেলে দেয়া হয়, আর সেভাবেই তার মৃত্যু হয়।
তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ আছে। কেউ বলেন বিষপ্রয়োগের কথা, কারো মতে দীর্ঘদিনের কারাযন্ত্রণা আর কষ্টই তার মৃত্যুর কারণ।
ঘটনা যাহোক, নিজের বিবেকের সাথে আপস না করার মূল্য তাকে জীবন দিয়েই শোধ করতে হয়েছে। তার জানাজায় এত মানুষ জড়ো হয়েছিল যে, ৬ বার জানাজা পড়াতে হয়! এতটাই ছিল মানুষের ভালবাসা।
ইমাম আবু হানিফার এক প্রতিবেশী ছিলেন, পেশায় মুচি। প্রায় রাতেই মদ খেয়ে বাড়ি ফিরতেন, তারপর স্ত্রীর সাথে চিৎকার-চেঁচামেচি করত। মহল্লার লোকজন একসময় বিরক্ত হয়ে ইমাম সাহেবের কাছে গিয়ে নালিশ দিল- এমন বড় একজন ইমাম যখন এই মহল্লায় আছেন, তিনি নিশ্চয়ই কিছু একটা করবেন।
ইমাম সাহেব মুচিকে ডেকে বোঝালেন, মদ ছেড়ে দাও। কয়েকদিন সব শান্ত রইল, তারপর আবার সেই একই দৃশ্য।
এবার মহল্লাবাসী সরাসরি গভর্নরের কাছে গেল। পুলিশ এসে মুচিকে ধরে নিয়ে গেল সেই রাতেই।
রাতে কোনো চিৎকার-চেঁচামেচি না শুনে ইমাম সাহেব ভাবলেন, যাক, তাহলে তার নসিহতে কাজ হয়েছে। কিন্তু পরদিন ফজরের নামাজে যাওয়ার পথে হঠাৎ কানে এলো মুচির স্ত্রীর করুণ কান্না। থেমে গেলেন, জিজ্ঞেস করলেন- মা, কী হয়েছে, কাঁদছ কেন?
মহিলা কেঁদে কেঁদে বললেন, স্বামীকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে, ঘরে খাবার নেই, বাচ্চাদের নিয়ে সবাই না খেয়ে বসে আছেন।
এই কথা শোনার পর ইমাম সাহেব আর মসজিদের দিকে এগোলেন না। সোজা বাড়ি ফিরে স্ত্রীকে বললেন, নাশতা তৈরি করে ঐ বাড়িতে পাঠিয়ে দাও। এই ব্যবস্থা করার পরই তিনি আবার রওনা দিলেন মসজিদের দিকে।
পরদিন নিজে গিয়ে গভর্নরের কাছ থেকে মুচিকে ছাড়িয়ে আনলেন। সেই মুচি ছিলেন খ্রিস্টান। কিন্তু এটা ইমাম সাহেবের কাছে কোনো বিবেচ্যই ছিল না। বিপদে পড়া একজন মানুষ- ব্যস! এতটুকুই যথেষ্ট ছিল সাহায্য করার জন্যে!
বিপন্ন মানুষের কোনো জাত-পাত হয় না- এই সহজ সত্যটাই বোধ হয় সেদিনের ঘটনার আসল শিক্ষা!
আসলে ইমাম আবু হানিফার জীবন দেখলে বোঝা যায়, জ্ঞানী হওয়া মানে শুধু বই মুখস্থ করা নয়। প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্তে সততা আর মানবিকতা ধরে রাখাটাই আসল। সমালোচনার জবাব না দেয়া, অন্যকে বিচার করে সময় নষ্ট না করা, সত্যের পথে অটল থাকা, আর বিপদে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়ানো-এই কিছু কথা যদি নিজেদের জীবনে অনুসরণ করতে পারি, এটাই হবে তাকে দেয়া সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধা।
তিনি ১৫০ হিজরি, ৭৬৭ খ্রিস্টাব্দে, ইরাকের বাগদাদে ইন্তেকাল করেন। বয়স হয়েছিল আনুমানিক ৬৮ বছর।
ইন্তেকালের পরও তার জ্ঞান থেমে যায় নি। আজও তার নাম উচ্চারিত হয় শুধু একজন ফকিহ হিসেবে নয়, বরং এমন একজন আলেম হিসেবে, যিনি জ্ঞানকে জীবনের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন।
আজ তার জন্মদিনে আমরা জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও সম্মান।